আলটিমেটাম কি বুমেরাং হবে?

সাংগঠনিক শক্তি রাজনৈতিক দলের মূল ভিত্তি। এই শক্তির বলেই রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে এবং রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বহু দল রাজনীতিতে সফল হয়েছে সাংগঠনিক শক্তির বলে, আবার বিলুপ্ত হয়েছে সাংগঠনিক দুর্বলতায়। রাজনৈতিক নেতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে কর্মীরা মাঠে নামবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দক্ষ, সুদৃঢ় এবং দূরদর্শী হতে হয়। নেতৃত্বের দুর্বলতা কিংবা অদূরদর্শী নেতৃত্ব কখনোই কোনো সফল আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে না। এছাড়াও যে কোনো আন্দোলনকে সফল করতে শক্ত এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও জনবান্ধব ইস্যু প্রয়োজন। আর তা না হলে রাজনৈতিক কর্মসূচিও অনেক সময় নিজের দলের কাছেই বুমেরাং হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আগামী ১০ ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশ চলবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথায়; এর বাইরে আর কারো কথায় দেশ চলবে না।’ তার সঙ্গে একই সুরে কথা বলেছেন বিএনপির আরো একাধিক নেতা। যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘খেলা হবে ডিসেম্বরে।’ অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘১০ ডিসেম্বরের পর বিএনপিকে লালকার্ড দেখানো হবে।’ এ পরিস্থিতিতে লক্ষ করা যাচ্ছে, উভয় দলই একপ্রকার মুখোমুখি অবস্থানে।

রাজনীতিতে এমন ঘোষণা বা আলটিমেটাম নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিকে তৃণমূল পর্যায়ে চাঙ্গা করার লক্ষ্যে অনেক সময় কেন্দ্র থেকে এ ধরনের ঘোষণা সামনে এনে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের বিএনপির আলটিমেটামের কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি না, সেটি বিশ্লেষণ করা দরকার। ডিসেম্বরে আসলে কী খেলা হবে, কারা খেলবে, কতগুলো পক্ষ থাকবে, আসলেই কোনো খেলা হবে কি না, নাকি হুংকার-পালটা হুংকার, সেটি নিয়েও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে। আর এই বিশ্লেষণের লক্ষ্যেই এই লেখার সূত্রপাত।

আমরা জানি, ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ঘোষণা করেছিলেন, ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সরকারের পতন ঘটানো হবে। তার হাতে ট্রাম্পকার্ড রয়েছে। যদিও সেই ৩০ এপ্রিল সরকারের পতন হয়নি। সেই ট্রাম্পকার্ড নিয়ে রাজনীতিতে একটা বিশাল উত্তেজনা ছিল। তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার এ বিষয়ে তৎপর ছিল। আসলেই ৩০ এপ্রিল কী হতে যাচ্ছে, সেটি ছিল সাধারণ জনগণের মাথায়। আবার সরকারও শঙ্কিত ছিল, আসলে কী হতে যাচ্ছে ৩০ এপ্রিল। মানুষের মনেও দারুণ কৌতূহল তৈরি হয়। ঐ সময়ে আওয়ামী লীগও চেয়েছিল, একটি বিশাল গণজমায়েত করতে।

বিএনপির সাম্প্রতিক ঘোষণা তৎকালীন সময়ের আবদুল জলিলের ঘোষণার মতো অতটা আলোড়ন তৈরি করতে পারেনি, বরং কিছুটা হাস্যরসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ কথা সত্য যে, বিএনপিও ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণজমায়েত করার উদ্দেশ্য নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে কয়েক লাখ লোক জড়ো করে ঢাকায় শো-ডাউনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের সক্ষমতা জানান দিতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই গণজমায়েত কর্মসূচিতে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে অবস্থান নিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দেওয়ার পাশাপাশি ঢাকার রাজপথ দখলে নেওয়ার টার্গেটও রয়েছে তাদের। ইতিমধ্যেই তারা বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি যেভাবে মাঠ দখলের লক্ষ্যে টার্গেট দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তার জন্য যে ধরনের সাংগঠনিক শক্তি তাদের দরকার, সেটি কি তাদের আছে? তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় (২০০১-২০০৬) বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যেভাবে রাজপথে সক্রিয় ছিল, সেভাবে বিএনপির সক্রিয়তা কি আছে? আর এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে বিএনপি এবং তাদের শরিকরা কি রাজনীতির মাঠ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবেন? 

সাধারণভাবে চিন্তা করলে মোটেও এটা সম্ভব নয়। আর বিএনপির চলমান হুমকি-ধমকি এবং আলটিমেটাম যদি আংশিকভাবেও বাস্তব রূপ না পায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে যে কোনো পরিস্থিতিতেই বিএনপি জনগণের আস্থায় আর আসতে পারবে না। ভোটের ফলাফলও তাদের অনুকূলে যাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। রাজনীতির সূত্র অনুযায়ী রাজনীতির মাঠ দখলে না থাকলে ভোটের মাঠও দখল আসার সুযোগ থাকে না। 

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখনো এক বছরের বেশি সময় বাকি। আওয়ামী লীগের গত তিন মেয়াদে অবকাঠামো খাতে দৃশ্যমান উন্নয়নও হয়েছে ব্যাপক। সেই উন্নয়নের সুফল দেশবাসী ভোগ করছে। একটি দল যখন দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, তখন তার অনেক সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা নিজেদের সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখতে সরকারের পক্ষে সব ধরনের চেষ্টা করে। বর্তমান সরকার প্রতিটি ইউনিটে তাদের সাংগঠনিক শক্তি মজবুত করে তুলেছে। পক্ষান্তরে বর্তমান বিরোধী শক্তি হতাশাবন্দি হয়ে তাদের সাংগঠনিক শক্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজপথে বিএনপি ও তাদের শরিকদের মোকাবিলা করার যথেষ্ট শক্তি আওয়ামী লীগের রয়েছে।

সুতরাং ১০ ডিসেম্বরের পরে দেশ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশে চলবে—এই জাতীয় বায়বীয় বক্তব্য বিএনপির সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টির কোনো প্ল্যাটফরম তৈরি করতে পারবে না। তাদের মূল দাবি যে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার, সেটি আদায়ের জন্য যে ধরনের জনমত গড়ে তোলা দরকার, সেটি না করে অদূরদর্শী বক্তব্য প্রদানে ব্যস্ত রয়েছে। এই মুহূর্তে জনগণকে নিজেদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি করতে বিএনপির উচিত নিজস্ব কর্মসূচি ও দলীয় স্বার্থে নানাবিধ এজেন্ডা সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে সরকারি দলেরও এমনটি ভাবলে হবে না যে, বিএনপিকে দিয়ে রাজপথে সফল আন্দোলন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এমন চিন্তাভাবনাও বোকামির শামিল। কারণ প্রতিটি দলের রাজনৈতিক একটি কর্মকৌশল থাকে, আর তা অবশ্যই গোপনীয়। 

এ কথা সত্য যে, বিএনপির রাজনীতিতে এখন আর অভিনবত্ব নেই। একটি চলমান আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি এবং কৌশল রাজনীতির অনেক উপাদান নির্ণয় করে থাকে। কিন্তু বিএনপি বিভিন্ন সময়ে যে আন্দোলনের উদ্যোগ নিয়েছে তার সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্য ইস্যু না থাকায় শুরুতেই হোঁচট  খেয়েছে। এক কথায় বলা যায়, তারা অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে তাদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। আন্দোলনের গতি ধরে রাখতে নেতারা অনেক উসকানিমূলক, উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য, বিবৃতি দিলেও সেগুলোর প্রকৃত কোনো ফল আসেনি। আন্দোলন মানেই রাজপথভিত্তিক উত্তাপ সৃষ্টি এবং ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হওয়া—এমন চিন্তাভাবনা থেকে বিএনপি প্রকৃতপক্ষে বের হয়ে আসতে পেরেছে কি না—সেটি নিয়ে এখনো সাধারণ জনগণের মনে শঙ্কা রয়েছে। আর এ কারণেই আগামী ১০ ডিসেম্বরকে নিয়ে তারা যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে যেন কোনো সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও সরকারকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। তাছাড়া এটিও খেয়াল রাখতে হবে যে, ১০ ডিসেম্বরের ইস্যুতে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী যেন তাদের অপতত্পরতার মাঠ তৈরি না করে। কাজেই বিএনপির দেওয়া আলটিমেটামের কোনো ভালো ফল আদৌ বিএনপির ঘরে যাবে, নাকি তাদের জন্য বুমেরাং হবে—সেটিই দেখার বিষয়।

লেখক :অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়