চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই খুন হয়েছিলেন মতিঝিল এজিবির কলোনীর সন্ত্রাসী রিজভী হাসান ওরফে বোচা বাবু। সেই হত্যা মামলার বিচারের মাঝপথে এসে আদালত পরিবর্তনের আবেদন করেছেন অন্যতম আসামি সুমন সিরদার ওরফে মুসা সিকদার। যিনি মতিঝিলের আওয়ামী লীগ নেতা টিপু হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।
বাবু হত্যা মামলায় আসামি পক্ষের যুক্তি, মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনানুযায়ী ১৩৫ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়ায় পূর্বের বিচারিক আদালত ৪র্থ ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে ফেরত পাঠানো হোক। তবে এই যুক্তি আইনসঙ্গত না হওয়ায় আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১।
সেই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন ওই আসামি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ রোববার আবেদনটি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, আবেদন খারিজ হওয়ায় ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার কাজ চলতে আর কোনো আইনগত বাধা থাকল না।
২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে সন্ত্রাসী রিজভী হাসান ওরফে বোচা বাবু খুন হন। সেই খুনের ঘটনায় তার বাবা আবুল কালাম মতিঝিল থানায় হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে পুলিশ বলেছে, আসামি মুসা ও ভিকটিম বাবু দুজনেই মতিঝিলের যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকে আওয়ামী লীগ নেতা (ঢাকা দক্ষিণ ১০ নম্বর ওয়ার্ড) ওমর ফারুক ওরফে ফারুকের সঙ্গে সখ্যতা ছিলো সুমনের। আর ফারুকের বডিগার্ড হিসাবে কাজ করত নাসির। এছাড়া এজিবির কলোনী এলাকার ফুটপাতের টাকা , মুরগী পট্টি ও বাজারের চাঁদা উঠাত। এছাড়া আসামি নাসির, সাগর ও বাবু এক সময় একসঙ্গে চলাফেরা করত। বাবু দীর্ঘদিন পর এলাকায় ফিরেই চাঁদাবাজি শুরু করে। সেই চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই বাবুর সঙ্গে নাসিরের বিরোধ সৃষ্টি হয়। ফলে বাবুকে সরিয়ে দেয়ার জন্য ফারুককে বলে নাসির। এরপর বাবুকে খুন করার এক মাস আগেই ফারুক ফোন দিয়ে মুসাকে টিএন্ডটি পোষ্টাল ক্লাবে দেখা করতে বলে। পরদিন সন্ধ্যায় মুসা টিএন্ডটি ক্লাবের পার্শ্বে রেষ্ট হাউজের ছাদে যায়। সেখানে ফারুক ও নাসির ছিলো। নাসির বলে, বাবু এলাকায় এসেই চাঁদাবাজি শুরু করেছে। তার জন্য কোথাও কিছু করা যায় না। বাবুকে হিট করা লাগবে। মুসার কাছে নাসির হিট করার লোক চায়। তখন মুসার পদের ব্যাপরটা দেখবে বলে আশ্বাস দেয় ফারুক। নাসিরের কাজটা মুসাকে করে দিতে বলে। সেই মোতাবেক মুসা তার ছোট ভাই আসামি আবু সালেহকে কোরবানি ঈদের দুই দিন আগে নাসিরের মোবাইল নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজটা করে দিতে বলে। সালেহ ওইদিন সন্ধ্যার পর ফকিরাপুল মোড়ে নাসিরের সাথে দেখা করে। নাসির মতিঝিল এজিবি কলোনীতে নিয়া ভিকটিম বাবুকে চিনিয়ে দেয় এবং খুন করতে বলে। ঘটনার দিন বেলা ১২ টার সময় সালেহকে ফোন দিয়ে ওইদিনই কাজটা করে দিকে বলে মুসা। একইসঙ্গে আসামি অমিতের নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। আরও বলে নাসির একটা রিভলবার দিবে ও অমিত একটা পিস্তল নিয়া যাবে। পরিকল্পনা মোতাবেক রাতেই গুলি চালিয়ে বাবুকে হত্যা করা হয়। সেই সময় বাবুর বন্ধু ইমনও গুলিবিদ্ধ হয়।
পরে চিকিৎসকের ময়না তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, ভিকটিমের মৃত্যু হয় গুলিতে জখমপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে। পরে নাসির, আবু সালেহ, মুসা, ফারুক ও আসিফের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. কামরুল ইসলাম। আর ১৩ জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়।
এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের পর ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহন করেছে ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষ্যগ্রহনের পর মামলাটি দ্রত বিচার ট্রাইব্যুনাল থেকে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে ফেরত পাঠানোর আবেদন করেন।
ওই আবেদনে বলা হয়, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনের ১০ এর (১)(২)(৩) উপধারা (২)(৩)(৪) এর বিধানমতে ১৩৫ কার্যদিবসের মধ্যে মামলাটির বিচার শেষ করার কথা। কিন্তু ৩০৯ দিন অতিবাহিত হয়েছে। ফলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এ মামলার বিচার হওয়ার আর কোন সুযোগ নাই। গত ৩ অক্টোবর ওই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন আসামি। তার পক্ষে আইনজীবী ফখরুল ইসলাম ও তাহরিমা সালমা লিনা শুনানি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনিরুল ইসলাম। শুনানি শেষে আদালত আবেদনের পক্ষে আদেশ দিতে না চাইলে উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজের আবেদন করেন আসামির আইনজীবী। পরে হাইকোর্ট আবেদনটি উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দেয়।
দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে দুই ডজন মামলা
মুসা ও সালেহ দুই ভাই। তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায়। সেখান থেকে ঢাকায় এসে তারা পল্লবীতে বসবাস করেন। এর মধ্যে মুসার বিরুদ্ধে ১১টি মামলা এবং সালেহর বিরুদ্ধে ১২টি মামলা রয়েছে। মুসা রাজধানীর মতিঝিলে আওয়ামী লীগ নেতা টিপু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। ইন্টারপোলের সহায়তায় ওমান থেকে তাকে দেশে ফেরত আনে পুলিশ প্রশাসন।
প্রসঙ্গত, বোচা বাবু হত্যা মামলায় জামিন পেয়ে পলাতক হয়েছিলেন মুসা। এখন এই মামলায় তিনি কারাগারে। বোচা বাবু হত্যা মামলায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মুসা বলেছেন, তিনি চট্টগ্রামে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। দীর্ঘ ১৫/২০ বছর যাবত মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনীর ১০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। ফারুক ভাই পদ পাওয়ার পর তিনিও পদের জন্য তার নিকট অনুরোধ করেন। বিপদে আপদে ফারুক ভাইয়ের পাশে থাকবেন বলে অঙ্গীকার করেন।