বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির কারণ ও প্রতিকার

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি এখন একটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শিক্ষকগণ বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন। যেসব শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসছে, তাদের পড়াচ্ছেন এবং বিদ্যালয় শেষে আবার বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। এটা শিক্ষকগণের প্রতিদিনের রুটিন। কত জন শিক্ষার্থী আজ বিদ্যালয়ে আসেনি? কেন তারা বিদ্যালয়ে আসেনি? কবে আসবে? এসব বিষয় খবর নেওয়ার কাজটি শিক্ষক তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ভাবছেন বলে মনে হয় না। যদিও বারবার বলার পর মোবাইল ভিজিট বা হোম ভিজিট করেন, তাও হয় দায়সারা গোছের বা নিয়ম রক্ষার্থে। 

প্রায়ই খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, বিদ্যালয়ে প্রায় অর্ধেক ছাত্রছাত্রী উপস্থিত হয়নি। শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণগুলো কী হতে পারে? হতে পারে ভৌত বা অবকাঠামোগত অভাব বা হতে পারে শিক্ষকগণের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব এবং হতে পারে নিয়মিত তদারকি বা ফলোআপ না করা ইত্যাদি। 

ভৌত বা অবকাঠামোগত অভাব বলতে বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকা, টয়লেট বা ওয়াশব্লক, টিওবওয়েল না থাকা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য ভবনে সংযুক্ত র?্যাম্প না থাকা, খেলাধুলার প্রয়োজনীয় উপকরণ ও মাঠ না থাকা। ফলে এসব সুবিধাদি না থাকায় আমরা বলতে পারি : বিদ্যালয়টা শিশুশিক্ষার জন্য উপযুক্ত নয়। নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ (পযরষফ ভত্রবহফষু ধহফ যড়সবষু বহারত্ড়হসবহঃ) পেতে বা সাজিয়ে রাখা হয়নি।  বিদ্যালয়ে শিশুর খেলাধুলার পরিবেশ বা উপকরণ নেই। তাই শিশু বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে না। ফলে বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতও হয় না। যদিও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশ হিসাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের শেষ নেই। প্রতিটি বিদ্যালয়ে নতুন নতুন শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যাপক হারে এবং প্রতি তিন বছর অন্তর ২ লাখ টাকা করে ক্ষুদ্র মেরামত খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া জরুরি ভিত্তিতে শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন হলে স্কুল ইন ইমার্জেন্সি প্রজেক্ট (ংপযড়ড়ষ রহ বসবত্মবহপু ঢ়ত্ড়লবপঃ) থেকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও বিদ্যালয়ে প্রতি বছর স্লিপ, রুটিন মেইনটনেসসহ বিভিন্ন খাতে গড়ে লক্ষাধিক টাকা বিদ্যালয়ে বরাদ্দ পাচ্ছে শুধু শিশুর শিখন কার্যক্রম ত্বরান্বিত এবং বিদ্যালয়টাকে শিশুর জন্য আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করার নিমিত্ত। এখন যদি এসব কাজ বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে না হয়ে থাকে, তার জবাব কাজ বাস্তবায়নকারী সংশ্লিষ্টগণই দিতে পারবেন। 

দ্বিতীয় কারণটি হলো শিক্ষক মহোদয়গণের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। অনেক প্রধান শিক্ষক জানেনই না যে, তিনি বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্টভুক্ত বিদ্যালয়-গমনোপযোগী সব শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছেন। তেমনিভাবে একজন সহকারী শিক্ষক বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্টভুক্ত নির্ধারিত ব্লকের প্রাথমিক শিক্ষার লিডার বা সরকারি প্রতিনিধি। ব্লকের সব গমনোপযোগী শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত। ক্যাচমেন্টের সব শিশু কিন্তু মাদার বিদ্যালয়ে (সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে) পড়ে না। আবার কিছু শিক্ষার্থী ক্যাচমেন্টের বাইরে থেকে এসে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। শিশু বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছে না কেন, তা জানতে শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। নিজ সন্তানকে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠানো হয় না কেন? সাফ জবাব প্রায় সব একই রকম। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকগণ পড়ানোর ব্যাপারে আন্তরিক নন। বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে বসে থাকতে দেখা যায়। শিক্ষকদের কিছু বললে শিক্ষকগণ উলটা বলেন যে, বাড়িতে না পড়লে কেমনে শিখবে? অভিভাবকগণ তদারকি কর্মকর্তাদেরও অভিযুক্ত করে বলেন যে, তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ের খোঁজখবর নেন না। এই লেখক তিনটি বিদ্যালয়ের ৪০ জন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর বাড়ি গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। অভিভাবকদের মূল অভিযোগ শিক্ষকগণ পড়াতে চান না। ফলে অভিভাবকগণ সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনাগ্রহ দেখান। 

শিক্ষকগণ আন্তরিক নন। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? প্রথমত শিক্ষকগণের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। যেহেতু আমি এই দায়িত্ব পালনের জন্যই নিযুক্ত হয়েছি, আমাকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং সফল হতে হবে। তার আগে তৃপ্তির বিশ্রাম নয়। অন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি হলো এই শিক্ষার্থী চাষার, দিনমজুরের বা ভ্যানগাড়ি চালকের সন্তান, সে কীই-বা লেখাপড়া করবে? এই ধারণা বদ্ধমূল থাকার কারণে শিক্ষকগণের প্রচেষ্টার পারদ ক্ষেত্রবিশেষে উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করে থাকে। ফলে শিশুটি নিষ্পাপ হলেও শুধু তার বাবা-মায়ের পরিচয়ের কারণে এবং শিক্ষকগণের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অভাবে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ে যায়। অথচ কবির ভাষায় আমরা শিশুকে পড়াই, ‘কৃষকের ছেলে কিংবা রাজার কুমার, সকলেরই রয়েছে কাজ এই বিশ্ব মাঝার।’

তাছাড়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক আছেন, যাদের প্রতিদিন অন্তত ছয়টা ক্লাস নিতে হয়। ফলে সেই শিক্ষকগণের ক্লাসের বাইরে অন্য কোনো চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষক চাইলেই শিশুর অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান ও তার সুষ্ঠু সমাধান বের করতে পারেন। একজন তদারকি কর্মকর্তা নিয়মিত বিদ্যালয়ে গেলে বিদ্যালয়ের গুণমান উন্নয়ন হবেই। কারণ তার চোখে যেসব ত্রুটিগুলো দৃশ্যমান হবে, শিক্ষকগণের পক্ষে বিদ্যালয়ের ভেতরে থেকে তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু বাস্তবে কি তা ঘটছে? নিয়মিত তদারকির অভাবে বিদ্যালয়গুলো আজ ঝিমিয়ে যাচ্ছে। যেসব উপজেলায় ৩০ শতাংশ জনবল নিয়ে চলছে তাদের কথা বাদই দিলাম। যেখানে শতভাগ জনবল বা তদারকি কর্মকর্তা উপস্থিত, সেখানে কেন ক্যাচমেন্ট এলাকার সেরা বিদ্যালয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হবে না? মূলত তদারকি কর্মকর্তাদের (টিইও এটিইও) অবহেলা ও উদাসীনতাই প্রধানত দায়ী। তাছাড়া নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে এবং শিক্ষকগণের সঙ্গে আঁতাঁত ও অন্যায় সম্পর্ক স্থাপন করে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষতি সাধন করছেন একশ্রেণির তদারকি কর্মকর্তা। তাই টার্গেট ভিজিট (৫টা, ১০টা) পূরণ মাথা থেকে ঝেরে ফেলতে হবে। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হবে। শিক্ষকগণের ঘাটতিগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে ধরিয়ে দিতে হবে। 

তাছাড়া এমন অনেক বিদ্যালয় আছে, যেখানে শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীর অনুপাত কম। আবার এমন বিদ্যালয় আছে, যেখানে শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীর অনুপাত অনেক বেশি। ফলে উপজেলায় কৃত্রিম শিক্ষকসংকট দেখা যায়। এই কাজটি উপজেলা শিক্ষা অফিসার শিক্ষক সমন্বয়ের মাধ্যমে সুন্দর সমাধান করতে পারেন। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাব প্রতীয়মান হয়। তা নাহলে হাজার হাজার মামলার দোহাই দিয়ে যথার্থ কাজটি অসম্পূর্ণ থাকত না। থাকত না তদারকি কর্মকর্তার কোনো শূন্যপদ পূরণ করার বাকি। শতভাগ কর্মকর্তা পদায়িত আছেন, এমন উপজেলা থেকে অন্তত একজন করে কর্মকর্তা যদি ৭০ শতাংশ পদশূন্য উপজেলায় বদলি করে পদায়ন করা যায়, তাহলে হয়তো পদশূন্য উপজেলাগুলো প্রাথমিক শিক্ষাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত। কর্তৃপক্ষ কেন তা করছেন না, তা সিনিয়রগণই বলতে পারবেন।

লেখক : উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, মাধবপুর, হবিগঞ্জ