কাপ ভরা বৃষ্টি

ইকবাল খন্দকার

 

আমার পরিচিত এক গীতিকারকে বললাম, ‘আপনি তো প্রতিবারই বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে গান লেখেন। এবার লিখেছেন তো? কয়টা লিখেছেন?’

গীতিকার বললেন, ‘লিখেছিলাম বেশ কটা, বেশ কজন শিল্পীর জন্য। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি দেখছি, তাতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, একটা গানও কাউকে দেব না। এমন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়লে নতুন গানের আর দরকার আছে? আগে যা গান হয়েছে, তাতেই চলবে।’

আমি বললাম, ‘আগে আবার কোন গান হলো?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘ওই যে রবীন্দ্রনাথের লেখা গানটা। আমি মনে করি, ওই গানটা হতে পারে এবারের বিশ্বকাপের টাইটেল সং।’

আমি বললাম, ‘কোন গানটা, একটু যদি বলতেন।’

ভদ্রলোক বললেন, ‘আরে ভাইরে, ওই যে ওই গানটা—বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান...। হ্যাঁ, গানের কথায় সামান্য পরিবর্তন আসতে পারে বৈকি। যেমন :বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর মাঠে এলো বান।’

 

আমার এক ছোট ভাই বৃষ্টির অত্যাচারে যারপরনাই অতিষ্ঠ। পারলে বৃষ্টিকে ধরে পেটায়। তার সঙ্গে বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে কথা শুরু করতে না করতেই সে বলে উঠল, ‘আর বলবেন না ভাই। পরিস্থিতি মানুষকে অনেক কিছু করতে, অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।’

আমি বললাম, ‘তা তো বটেই। তা তোকে কোন পরিস্থিতি কোন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল, একটু জানতে পারি?’

ছোট ভাই বলল, ‘আপনি তো জানেনই আমি প্রয়াত নায়ক সালমান শাহের অন্ধভক্ত। তার যেকোনো সিনেমার যেকোনো গান আমি বারবার শুনি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে যেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো পরিত্যক্ত হতে শুরু করল, আমি সালমান শাহ অভিনীত একটা গান শোনা থেকে একদম বিরত থাকলাম। বিরত থাকতে থাকতে এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, গানটা শুনলেই আমার রাগ উঠে যায়। নিজে তো গানটা বাজাই-ই না, কোথাও বাজতে শুনলেও গিয়ে বন্ধ করে দিয়ে আসি।’

আমি কিছুক্ষণ থ হয়ে বসে থেকে বললাম, ‘বুঝতে পেরেছি, গানটা তোর খুবই অপ্রিয় হয়ে গেছে। কিন্তু কোন গানটা যেন?’

ছোট ভাই বলল, ‘ওই যে ‘স্বপ্নের পৃথিবী’ ছবির ‘বৃষ্টিরে বৃষ্টি আয় না জোরে...’।’

 

আমার এক প্রতিবেশী বললেন, ‘বৃষ্টির কারণে ম্যাচ পরিত্যক্ত হতেই পারে। এটা সবসময়ই হয়ে আসছে। আমাদের আমলে যেমন হয়েছে, আমাদের বাপ-চাচার আমলেও হয়েছে, এমনকি আমাদের দাদা কিংবা দাদার দাদাদের আমলেও হয়েছে।’

আমি বললাম, ‘সব ঠিক আছে। কিন্তু এই যে বললেন আপনার দাদার দাদাদের আমলেও নাকি হয়েছে, এটা ঠিক মানতে পারলাম না। কারণ, এত বছর আগে ক্রিকেট খেলা আবিষ্কৃত হয়েছিল কি না, এ ব্যাপারে আমি সন্দিহান। আর ক্রিকেট খেলাই যদি আবিষ্কৃত না হয়ে থাকে, তাহলে তো ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ার প্রসঙ্গটাও অবান্তর।’

প্রতিবেশী বললেন, ‘ম্যাচ বলতে আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন, আমার কাছে ঠিক ক্লিয়ার না। তবে আমি কিন্তু ম্যাচ বলতে দেশলাইকে বুঝিয়েছি। বৃষ্টিতে ভেজার কারণে আমার নিজেরই কত ম্যাচ পরিত্যক্ত হলো! ও হ্যাঁ, আবারও বলি, ম্যাচ বলতে আমি কিন্তু দেশলাইকে বুঝিয়েছি। আর দেশলাইয়ে বৃষ্টির পানি লাগলে দেশলাইটাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে কিন্তু উপায় থাকে না।’

আমার এক বড়ভাই ক্রিকেটের ঘোরবিরোধী। সুযোগ পেলেই তিনি ক্রিকেটের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই খেলার কারণে নাকি মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তো যখন তিনি শুনলেন বৃষ্টির কারণে বেশ কটা ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়ে গেছে, তিনি ক্রিকেটের বদনাম করার ভালো একটা মওকা পেয়ে গেলেন। দীর্ঘ দশ মিনিট বদনাম করার পর তিনি বললেন, ‘যেহেতু বৃষ্টি নিয়ে এত সমস্যা, তাই আমি বলি কী, এই সিজনে ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়োজন না করে লুডু বিশ্বকাপের আয়োজন করা হোক। লুডু বিশ্বকাপ হলে হবে কি, ঘরে বসে খেলতে পারবে। বৃষ্টির কারণে কোনো সমস্যা হবে না।’

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ক্রিকেট আর লুডু এক হলো?’

বড়ভাই খেঁকখেঁকিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘কেন এক হবে না? ক্রিকেটে ছক্কা আছে, লুডুতেও ছক্কা আছে। ঠিক কি না?’