যেখানেই বিএনপির সমাবেশ, সেখানেই পরিবহন ধর্মঘট, যুবলীগের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে সমাবেশকে ঘিরে যানজট। দুই রাজনৈতিক দলের কর্মসূচির কারণে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
শুক্রবার আওয়ামী যুবলীগের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত মহাসমাবেশে সড়ক বন্ধ, যানবাহন সংকট, যানজট সব মিলিয়ে ছুটির দিনে রাজধানীতে বের হওয়া মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। অন্যদিকে, শনিবার ফরিদপুরে বিএনপির সমাবেশের একদিন আগে থেকে আট জেলায় চলছে পরিবহণ ধর্মঘট। ভোগান্তি প্রহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জনগণের স্বার্থে নাকি রাজনীতি! তাহলে জনগণের সবক্ষেত্রে ভোগান্তি কেনো!
ইমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের এখানে রাজনীতির দু’টি ধারা-একটি সমাজ পরিবর্তনের, আরেকটি ক্ষমতা কেন্দ্রিক। ১৯৪৭, ১৯৬৯, ১৯৭১ সালে আমরা সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি দেখেছি। এখন যেটা হচ্ছে সেটা ক্ষমতা কেন্দ্রিক। দুই দল যে রাজপথে আছে, তাদের একটি দল ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, আরেকটি দল ক্ষমতায় আসতে চায়। ফলে তাদের উভয়ের আদর্শ একই। এখন যদি শিক্ষিত-সচেতন মানুষ সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিতে মনোযোগ দেয় তাহলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।’
শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের মহাসমাবেশের কারণে ঢাকার বেশকিছু সড়কের যান চলাচল বন্ধ ছিল। যেসব সড়কে যান চলাচল করেছে সেখানেও ছিল সমাবেশগামী বাড়তি গাড়ির চাপ। সকাল থেকে মিছিল-শোডাউন নিয়ে মহাসমাবেশস্থলে যেতে থাকেন নেতা-কর্মীরা। এতেও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, শাহবাগ, নিউমার্কেটসহ অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশের এলাকায় যানজট ছিল সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি মহাসমাবেশের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাস সংকট দেখা দেয়। সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা বাস রিজার্ভ নেওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। বাস সংকটে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছিলেন নারী ও বয়স্করা। বাস না থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালকরাও নিয়েছেন বাড়তি ভাড়া।
ফরিদপুরে শুরু হয়েছে বিএনপির সমাবেশ। কিন্তু এর আগে শুক্রবার থেকে ফরিদপুরের আশপাশের মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল বন্ধের দাবিতে এ ধর্মঘট ডাকে ফরিদপুর জেলা বাস মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। শুধু ফরিদপুর নয়, আশপাশের মাগুরা, রাজবাড়ি, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ ৮ জেলায় চলছে এই পরিবহন ধর্মঘট। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফরিদপুর জেলা বিএনপির অভিযোগ, শনিবার ফরিদপুরে তাদের বিভাগীয় গণসমাবেশে নেতা-কর্মীদের যাওয়া ঠেকাতে সরকার ও প্রশাসনের ইন্ধনে এই বাস ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। এর আগে গত ২২ অক্টোবর খুলনার এবং ৩০ অক্টোবর রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের আগেও সেখানকার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একই দাবিতে বাস ধর্মঘটের ডাক দেন। ধর্মঘটের কারণে শুক্রবার সকাল থেকেই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
রফিকুল ইসলাম নামে একজন বাস শ্রমিক বলেন, ‘আমরা ধর্মঘট করছি, আমাদের নেতারা বলছেন তাই। আমাদের নেতাদের কথায় চলতে হয়, তবে আমাদের তো টাকা আয় না করলে প্রতিদিন ঘরে চাল জোটে না। আমরা যে বসে আছি, এর জন্য কেউ আমাদের টাকা দিচ্ছে না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘আগামী বছর নির্বাচন। ফলে আমরা তো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে বলতে পারি না। কিন্তু রাজনীতিটা যেহেতু জনগণের জন্য ফলে তাদের এমন কর্মসূচি দিতে হবে যাতে জনগণ ভোগান্তিতে না পড়েন। এখন জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করতে গিয়ে তারা জনগণের বিরক্তির কারণ হয়ে যাচ্ছেন কিনা সেটাও তাদের ভাবতে হবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের সমাবেশ ‘সরকারি সুবিধায়’ হয়েছে। সব রাস্তা-ঘাট বন্ধ। এভাবে সব আয়োজন করা হয়েছে। বুঝতে পারেন একটা দলের সম্মেলন করতে তাদের এতো কিছু জোগাড় করতে হচ্ছে, সরকারি এতো কিছুর সুযোগ-সুবিধা নিতে হচ্ছে। রাস্তা-ঘাটের অবস্থা দেখে মনে হলো যে, বাংলাদেশ একটা একদলীয় শাসনের মধ্যে আছে। মনে হলো এখানে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠান হচ্ছে। অথচ বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের দুই-তিনদিন আগে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হচ্ছে। অর্থাৎ বিএনপির বেলায় সব বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির আন্দোলনটা এখন বিপ্লবে পরিণত হয়েছে।’
তবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘পরিবহন মালিকরা যদি বাস না চালান আমরা কী করতে পারি? আমি নিজে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে বিএনপির কর্মসূচিতে গাড়ি বের করতে ভয় পান পরিবহন মালিকরা। আর যুবলীগের সমাবেশ হয়েছে ছুটির দিন। যেদিন খুব বেশি মানুষ রাস্তায় বের হন না, অফিস আদালতও বন্ধ। জনগণের যাতে ভোগান্তি না হয় সেই চিন্তা থেকেই যুবলীগের সমাবেশ ছুটির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।’
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সমীর কুমার দে। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।