৩৫ বছর ধরে নারী দলকে নিয়ে পুঁথি পাঠ করেন মায়া রাণী

প্রায় ৩৫ বছর ধরে বিভিন্ন নারীদের দল নিয়ে পুঁথি পাঠ করা চাট্টিখানি কথা নয়। যেখানে আধুনিকতার জোয়ারে আজকাল পুঁথি সম্পর্কেই অবগত নন কেউ। সেখানে হাল ধরেন মায়া রাণীর মতো নারীরা। নারী দলকে নেতৃত্ব দিয়ে পুঁথি পাঠ করা সেই নারী হলেন মায়া রানী দাস। আমাদের সমাজের নারী শক্তির জয়গান শোনান তিনি, সঙ্গে এই উপমহাদেশের সংস্কৃতির চর্চাও জিইয়ে রাখেন।

শনিবার (১২ নভেম্বর) বিকালে মায়া রাণীর দলকে নিয়ে পুঁথি পাঠের আয়োজন করে ‘নিরিখ’। ‘নিরিখ’-এর যাত্রা শুরুর বর্ষপূর্তি এই নভেম্বরে। এ উপলক্ষে তার বাৎসরিক সঙ্গ আয়োজন করে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মহামিলন’। নিরিখের মহামিলনে অংশ নিয়ে পদ্মপুরাণ পুথির অংশবিশেষ পাঠ করেন মায়া রাণীর দল।

মায়া রাণী দাস ১৩৫২ বঙ্গাব্দের ১০ কার্তিক অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের ২৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলার লাঙ্গলবন্দে জন্মগ্রহণ করেন। মায়া রাণীর বাবা মহানন্দ দাস ছিলেন একজন গৃহী বৈষ্ণব সাধক। মহানন্দ দাস ২৪ বছর মৌনব্রত পালন করেন। লোকে তাকে বোবা সাধু বলে ডাকতেন। তাঁদের পৈত্রিক পেশা ছিল তাঁত বোনা। আদমজী জুট মিলের উল্টোদিকে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে ১ নম্বর ঢাকেশ্বরী কটন মিল গড়ে উঠলে, মিলে তাঁত বোনার চাকরি নিয়ে মহানন্দ দাস লাঙ্গলবন্দ ছেড়ে ঢাকেশ্বরী মওলে চলে আসেন। মায়া রাণীর কঠোর পরিশ্রমী মা মেঘবালা দাস সংসারের অভাব কিছুটা কমিয়ে আনতে তিনিও তাঁত শ্রমিক হিসেবে চাকরি নেন মিলে।

ছবি: ইত্তেফাক

চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে মায়া রাণী সবার বড়। তার কোনোদিন স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। বাবার কাছে হাতেখড়ি। বাল্যশিক্ষা থেকে অক্ষরজ্ঞান নিয়েই লক্ষ্মীর পাঁচালী দিয়ে তাঁর পুঁথিপাঠ শুরু খুব ছোটবেলা থেকেই। বাবা পাশে বসে শব্দের উচ্চারণ, সুর ঠিক করে দিতেন। ছোট ভাইকে কোলেকাখে রাখার জন্য মায়ারাণী যেহেতু স্কুলে যেতে পারছিলেন না, তাই বাবা তার জন্য বাসায় একজন শিক্ষক রেখে দেন। যার কাছে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করেন মায়া রাণী। শিক্ষক জয়চন্দ্র বর্মন বছর শেষে বাসায়ই তার পরীক্ষা নিতেন। কিন্তু তার পরপরই রূপগঞ্জের ভিংগ্রাব গ্রামের হরিদাস কর্মকারের সঙ্গে মাত্র ১১ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়ে যায় এবং বিধবা হন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে। 

বিয়ের পর শিক্ষক রেখে তাঁর ক্লাসের পড়া বন্ধ হলেও তিনি মাসে আট আনা চাঁদায় শ্রমিক কলোনির ক্লাব লাইব্রেরি থেকে বিভিন্ন গল্পের বই এনে পড়তেন। বই পড়ার পাশাপাশি সুঁচি কর্মে ছিল তার ভীষণ আগ্রহ। সারাদিন ছেলে-মেয়ে ঘর-সংসার সামলে যতটুকু অবসর পেতেন, হয় বই, নয়তো সুইসুতো নিয়ে বসে পড়তেন নতুন কোনো নকশা তুলতে কাপড়ে, চটে। বহু প্রকারের সেলাই জানতেন তিনি। যার গুনে স্বামীর মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জ শহরে একটি নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে মাসে ৩০ কেজি গম আর ১০ কেজি চাউল রোজগার করতে পারতেন সেই আশির দশকে। 

ছবি: ইত্তেফাক

ঢাকেশ্বরী মিলের মন্দিরের পুরোহিত প্রতি শ্রাবণ মাসে পদ্মপুরাণ পাঠ করতেন মহানন্দ দাসের বারান্দায় বসে। কলোনির আরও অনেকেই চলে আসতেন সেই পাঠ শুনতে। সেই সমাবেশের সর্বকনিষ্ঠজন ছিলেন মায়া রাণী। পুরোহিতের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সুর তুলতেন। ছোট মেয়েটার এমন আগ্রহ পুরোহিতের মনোযোগ কেড়েছিলো। তাই, তিনি যখন বাংলাদেশ শেষে ভারত চলে যান, যাওয়ার আগে ‘পদ্মপুরাণ’ গ্রন্থখানা মায়া রাণীর হাতে তুলে দিয়ে যান। বলেন, এখন থেকে তুমি প্রতি শ্রাবণ মাসে মনসামঙ্গল পাঠ করে শোনাবে সবাইকে।

পুরোহিত চলে যাওয়ার পর নিজে একা একা ঘরে পদ্মপুরাণ পড়লেও জনসম্মুখে পাঠ কারার সাহস করেননি। কারণ ইতোমধ্যে তাঁর পিতা মহানন্দ মৌনব্রত গ্রহণ করেছেন। ফলে পদ্মপুরাণ পাঠে পিতার সহযোগিতা পাওয়ার কোনো উপায় ছিলোনা। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের মানসিক প্রশান্তি এবং একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অন্ধ প্রতিবেশীর অনুপ্রেরণায় তিনি প্রথমে মহাভারত পাঠ করা শুরু করেন। প্রথম প্রথম মায়া রাণী পড়তেন, সেই অন্ধশ্রোতা বসে বসে শুনতেন, পাশে বসে থাকতেন। ‘বোবাসাধু’ বলে পরিচিত তাঁর পিতা মহানন্দ। তিনি আকার-ইঙ্গিতে লিখে মেয়েকে প্রতিক্রিয়া জানাতেন।

ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যয়ে মৃত্যুর আগেই তাঁর স্বামী আর্থিকভাবে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাঁর ৪ ছেলে ৩ মেয়ের বড় পরিবারে ভীষণ আর্থিক সংকট নেমে আসে। আরেক দিকে মিলের মালিকানা বদলে যায়, বন্ধ হয়ে যায় তাঁতকল। ২০০০ শ্রমিকের প্রায় সবাই কাজ হারিয়ে কলোনি ছাড়তে থাকে। সেই স্রোতে ভেসে মায়া রাণীর পরিবার নারায়ণগঞ্জ শহরে এসে ওঠে। 

শহরের ঘুপচি ঘরের ভেতরেই মা মনোসার পূজা চলে, চলে পদ্মপুরাণ পাঠ। ১৯৮৪ সাল থেকে করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত চলেছে তার বাড়ি বাড়ি ঘুরে পদ্মপুরান পাঠ। প্রথম দিকে নিজের ঘরেই পদ্মপুরাণ পাঠ করতেন, একে অপরের কাছ থেকে শুনে পাড়াপড়শিরা আসতেন তা শুনতে। তারপর এক একদিন এক একজনের বাড়িতে পদ্মপুরাণ পাঠ করার জন্য নিমন্ত্রণ পেতে থাকেন মায়া রাণী।

ছবি: ইত্তেফাক

কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী তাঁর দলের স্থায়ী সদস্য হয়ে পড়েন। তাঁর নারীদলে কোনো পেশাদার বাদক নেই, নিজেরাই কাশি, করতাল, কৃষ্ণকাঠি বাজিয়ে কীর্ত্তন। তাঁর এই দীর্ঘ পথ চলায় অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই, কেউবা নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে চলে গেছেন অন্য কোন শহরে। কিন্তু তবু থেমে থাকেনি মায়া রাণীর পদ্মপুরাণ পাঠসংঘ। নতুন যুক্ত হয়েছেন অনেক নারী।

কিন্তু কোভিড এসে বদলে দিয়েছে অনেক কিছুই। মায়া রাণী নিজেও কোভিডে আক্রান্ত হয়ে, ভীষণ লড়াই করে ফিরেছেন। কিন্তু ফেরেনি তাঁর শারীরিক কর্মক্ষমতা। কোভিডের ধাক্কায় তাঁর গানের দলের বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ কেউ বিদায় নিয়েছেন। তাঁরও বয়স এখন ৭৮। এই ইটপাথরের শহরের এপাড়া ওপাড়ায় বাড়ি বাড়িতে নিমন্ত্রণ নিয়ে পদ্মপুরাণ পাঠ তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। তবুও এই শ্রাবণে কাছাকাছি পড়শির বাড়িতে তিন দিন গিয়েছিলেন পদ্মপুরাণ পাঠ করতে। কিন্তু না, মনে প্রবল ইচ্ছা থাকলেও, শরীর-গলা আর তাঁর মনের কথা শুনছে না।

তবু মাঝে মাঝে পাটের চটের ওপর উল সুতার সেলাইয়ে জীবনের নকশা তুলতে বসেন, আর ভাবেন কার হাতে তুলে দিয়ে যাবেন মা মনসার এই পদ্মপুরাণ গ্রন্থখানা?