উদ্বেগ একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য বিষয়। তবে কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই দৈনন্দিন জীবনের বিষয়গুলো নিয়ে যদি কেউ উদ্বিগ্ন থাকেন, এই উদ্বেগের পরিমাণ যখন অত্যধিক ও অতিরঞ্জিত হয় এবং দৈনন্দিন ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, পেশাগত বা শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন এই উদ্বেগ দ্বারা পরিচালিত মানসিক সমস্যাই হলো জেনারালাইজ অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার। এর লক্ষণসমূহ হলো :১. বিভিন্ন বিষয়, ঘটনা বা ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে অত্যধিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার উপস্থিতি। এই উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কমপক্ষে ছয় মাস বা তার চেয়ে বেশি সময় থাকবে। ২. ব্যক্তির জন্য উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করা খুব চ্যালেঞ্জিং হয়। ৩. উদ্বেগ ও অ্যাংজাইটির নিম্নলিখিত লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্তত তিনটি বা তার বেশি থাকবে (শিশুদের মধ্যে, এই লক্ষণগুলোর মধ্যে শুধু একটি জেনারেল অ্যাংজাইটি নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয়) :ক. অস্থিরতা খ. সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্লান্ত হওয়া গ. মনোযোগে সমস্যা বা অনুভূতি যেন মন ফাঁকা হয়ে যায় ঘ. বিরক্তি (যা অন্যদের কাছে লক্ষযোগ্য হতে পারে বা না-ও হতে পারে) ঙ. মাংশপেশিতে অস্বস্তি চ. ঘুমাতে অসুবিধা (ঘুমিয়ে পড়তে বা ঘুমিয়ে থাকার সমস্যা, রাতে অস্থিরতা বা অতৃপ্ত ঘুম।
যেসব বিষয় জেনারালাইজ অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারকে প্রভাবিত করে তা হলো :ক. উদ্বেগ—সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় এই রোগের উদ্বেগগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যথা টাইপ-১ উদ্বেগ আর টাইপ-২ উদ্বেগ। টাইপ-১ উদ্বেগ অর্থ বা শারীরিক লক্ষণগুলোর মতো ননকগনিটিভ ঘটনা সম্পর্কে উদ্বেগকে বোঝায়, যেখানে টাইপ-২ উদ্বেগ বলতে বোঝায় নিজের চিন্তা প্রক্রিয়া সম্পর্কে উদ্বেগ বা উদ্বেগ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। খ. এড়িয়ে চলা—এই রোগীরা বিভিন্ন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলেন। যেমন—তারা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, অপ্রীতিকর সংবাদ ইত্যাদি এড়িয়ে যেতে পারেন, যা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে অন্তর্নিহিত বিশ্বাসের কারণে এড়িয়ে চলা বাহ্যিক বিপদ বাড়াতে পারে, যেমন নিজের প্রতি মনোযোগ এবং অপমানের দৃষ্টিতে দেখার আশঙ্কা বেড়ে যায়। গ. আশ্বস্ত হতে চাওয়া :তাদের বারবার আশ্বস্ত হতে চাওয়ার মূল লক্ষ্য হলো দুশ্চিন্তাকে চক্রাকারে বাধা দেওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের সূত্রপাতকে প্রতিরোধ করা। দুর্ভাগ্যবশত, এটি উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে এই আচরণ পালটা উদ্বেগ বাড়াতে পারে। ঘ. চিন্তা নিয়ন্ত্রণ :তারা উদ্বেগ দমন করার জন্য চিন্তা নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলো ব্যবহার করেন। এই ক্রমাগত উদ্বেগ না করার প্রচেষ্টাও অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এই সমস্যায় আক্রান্ত। তার মানে, বাংলাদেশের প্রায় ৬০ লাখ জনগণের বেশি এই সমস্যায় আক্রান্ত। এই রোগের সঙ্গে প্যানিক অ্যাট্যাক, সামাজিক ভীতি, সোমাটফর্ম ডিজঅর্ডার থাকতে পারে। এই রোগে অনেক দিন ভোগার কারণে কোনো কোনো ব্যক্তি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হতে পারেন। এসব রোগীর আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি। কেউ কেউ মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে মদ ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্যে আসক্ত হয়ে যেতে পারেন। বেশি দিন এই রোগের কারণে অনেকের শারীরিক ব্যথা, ঘুমের সমস্যা হয়, যা তার রোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এই রোগের রোগীদের থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা, বিশেষ করে হাইপোথাইরডিজম হতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের আইবিএস নামক গ্যাসট্রোইনসটেসটাইনাল সমস্যাও খুব বেশি হয়। অনেকেই হাইপারটেনশনে ভোগেন। এই রোগের কারণে দ্রুত হার্টের সমস্যা এমনকি ডায়াবেটিক-জাতীয় সমস্যাও হতে পারে। তাদের কাজের কোয়ালিটি ও উত্পাদনশীলতা কমে যায় বলে অনেকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকে। গবেষণায় দেখা যায়, এদের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা কমে গেছে।
এই রোগের মূল চিকিৎসা হলো সাইকোথেরাপি। সাইকোলজিক্যাল থিউরি ও প্রিন্সিপাল অনুযায়ী চিকিৎসা। সাইকোলজিক্যাল চিকিৎসার মধ্যে সিবিটি ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি ফলাফল পাওয়া যায়। পাশাপাশি কিছু ক্লায়েন্টের আবেগীয় ম্যানেজমেন্ট শেখাতে পারলে খুব ভালো কাজ করে। তবে রোগের পরিমাণ বেশি হলে মেডিসিন খেয়ে রোগের মাত্রা কমিয়ে সাইকোলজিক্যাল থেরাপি শুরু করতে পারলে ভালো হয়। অনেকে আবার কোনোভাবেই মেডিসিন খেতে পারেন না, তাদের ক্ষেত্রে শুধু সাইকোলজিক্যাল থেরাপি দিয়েই চিকিৎসা প্রদান করা হয়। তবে সিভিয়ার রোগীদের মেডিসিন ও সাইকোলজিক্যাল থেরাপি একত্রে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এই রোগের যথাযথ চিকিৎসা পেলে রোগীরা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। তাই এই রোগে আক্রান্ত হলে দ্রুতই বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন।
লেখক : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট