দিবস

মাথার উপর বটবৃক্ষ

 

আজ জুন মাসের তৃতীয় রবিবার। পৃথিবীর আরো ৮৭টি দেশের মতো বাংলাদেশেও উদযাপিত হচ্ছে বাবা দিবস।

একসময় ছিল বাবা মানে দূরের মানুষ। সংসারের রাশভারী একজন। তাঁকে সবসময় ঘিরে থাকে পাতলা পর্দার মতো ভয়, রাগ, শাসন আর গাম্ভীর্য। আবার কিভাবে যেন তার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় এক আকাশ নির্ভরতা আর একরাশ নিরাপত্তার অনুভূতি। তিনি ভালোবাসেন ঠিকই, স্নেহও করেন, কিন্তু সবই যেন সীমিত মাত্রায়। বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কে মিশে থাকে খানিকটা দূরত্ব, খানিকটা সংকোচ, খানিকটা ভীতি মেশানো শ্রদ্ধা। এ ছিল আগের দিনের বাবা।

এখনকার বাবা মানে সন্তানের বন্ধুর মতো, একদম কাছের মানুষ। স্নেহশীল। কর্তব্যপরায়ণ। সন্তানদের সব কাজের প্রশ্রয়দাতা। প্রত্যেক সন্তানের চোখে তার বাবা পৃথিবীর সেরা মানুষ। জীবনের প্রথম আদর্শ, প্রথম অনুকরণ, প্রথম নায়ক। পরিবার প্রথার প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি শিশুর নিষ্পাপ চোখে বাবাকে দেখে পরিবারের সবচেয়ে ক্ষমতাধর, জ্ঞানী, স্নেহশীল ব্যক্তি হিসেবে। বাবা মানে সন্তানের মাথার উপর স্নেহছায়ার বটবৃক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের নিকটবর্তী শহর ক্রেসটন। সেখানকার বাসিন্দা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট স্ত্রীর মৃত্যুর পর আর বিয়ে করেননি। মেয়ে সেনোরা লুইস ডটসহ ছয় সন্তানকে বড় করেন বাবার পরম মমতা দিয়ে। সেনোরা ছিলেন ছয় ভাইবোনের মধ্যে বড়। সেনোরা বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিল, বাবার অক্লান্ত পরিশ্রমেই তারা শিক্ষিত হতে পেরেছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে। বাবা কখনো তাদের মায়ের অভাব এতটুকু বুঝতে দেননি। বাবার ত্যাগ অতুলনীয়।

একবার মা দিবসের অনুষ্ঠানে চার্চে যায় সেনোরা। তখনই তার মাথায় চিন্তা আসে যদি মায়েদের সম্মান জানানোর জন্য একটি দিন থাকতে পারে, তবে বাবাদের জন্য কেন নয়? বিশেষ একটি দিনে বাবার প্রতি সম্মান জানানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জনমত গড়ে তুলল সে। বাবা দিবসের ধারণাকে আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রচার শুরু করল সেনোরা। সহায়তা চাইল স্পোকেন মিনিস্টারিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও স্থানীয় ত্রুিশ্চিয়ান যুব অ্যাসোসিয়েশনের কাছে। সাড়াও পেল। সেনোরার বাবার জন্মদিন ছিল ৫ জুন। প্রিয় বাবার জন্মদিনকে সামনে রেখে বাবা দিবসের প্রস্তুতি শুরু করলেও নানা প্রতিকূলতায় ও সময়ের স্বল্পতার কারণে তা পিছিয়ে যায়।

১৯১৩ সালে এই বাবা দিবসকে জাতীয় ছুটি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে একটি বিল তোলা হয়। ১৯১৬ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন স্পোকেইনে যান বাবা দিবসের উত্সবে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তিনি চেয়েছিলেন দিবসটিকে সরকারি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে। কিন্তু কংগ্রেস তাতে বাধ সাধে। কংগ্রেসের ভয় ছিল এর বাণিজ্যিকায়ন করা হবে। ১৯২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ক্ল্যাভিন কেলিজ দিবসটির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। ১৯২৬ সালে নিউ ইয়র্কে গঠন করা হয় জাতীয় বাবা দিবস কমিটি। অবশেষে ১৯৫৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বেনিস জনসন জাতীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের ঘোষণা দেন। অবশেষে ১৯৭২ সালে এসে বাবারা পান জাতীয় মর্যাদা। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন জুনের তৃতীয় রোববার জাতীয় বাবা দিবস পালনের স্বীকৃতি দেন।

আমরা হয়তো অনেক সময় মুখ ফুটে বাবাকে ভালোবাসি কথাটি বলতে পারি না। কিংবা বলা হয়ে ওঠে না। কিছু ভালোবাসা আছে যা মুখে না বললেও মনে মনে সহস্রবার বলা হয়ে যায়। আর যাকে উদ্দেশ্য করে বলা তিনি ঠিকই তাঁর অন্তর দিয়ে তা শুনতে পান। বুঝতেও পারেন।

বিশ্বের সব বাবা ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।