রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কি সফল হইবে?

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন। গত বুধবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যালয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইহার আগে সম্প্রতি শেষ হওয়া মুসলিম দেশগুলির সংগঠন ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনেও একই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এমনকি ওআইসি নেতারা এক ধাপ আগাইয়া গিয়া মিয়ানমারের দায়বদ্ধতার ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিয়া যাইবার লক্ষ্যে কাজ করিয়া যাইবার অঙ্গীকার করেন। তাহার পরও বিষয়টির শীঘ্র সমাধান হইবে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। ইতোমধ্যে জাপানে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করিয়াছে মিয়ানমার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ইহাকে জঘন্য মিথ্যাচার বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। শুরু হইতেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের প্রতিবেশী দেশটি যে ধরনের আচরণ করিয়া আসিতেছে তাহা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত।

এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বরাবরই ধৈর্যের পরিচয় দিয়া আসিতেছে। এই দেশে কেবল নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীই রহিয়াছে ১১ লক্ষাধিক। ইহার বাহিরেও কত রোহিঙ্গা আছে তাহার ইয়ত্তা নাই। তাহাদের এই দেশে শরণার্থী হইয়া আসিবার ঘটনা নূতন নহে। ১৯৭৮, ১৯৯১-৯২, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬-১৭ সালে কয়েক দফায় গণহত্যা ও দমন-পীড়নের মুখে তাহাদের বাংলাদেশে আসিবার ঢল নামে। বিশেষ করিয়া ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বড় ধরনের রোহিঙ্গা শরণার্থীর অনুপ্রবেশ শুরু হয়। মূলত অষ্টম শতাব্দীতে আরবদের আগমনের মধ্য দিয়া আরাকান অঞ্চলে মুসলমানরা বসবাস করিতে শুরু করেন। রোহিঙ্গাদের বংশধররা প্রাক্-ঔপনিবেশিক ও ঔপনিবেশিক আমলে স্বাধীন আরাকান রাজ্যেরই বাসিন্দা ছিলেন। সুলতানি আমলে বাংলার সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে এবং একসময় চট্ট্রগ্রাম অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত থাকায় তাহাদের এখানে চলাচল ছিল বইকি। তবে তাহারা আরব বংশোদ্ভূত এবং কোনোক্রমেই বাঙালি নহে। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিক হইতে তাহারা ভাগ্যবিড়ম্বনা ও দুর্ভোগের শিকার হইতে থাকে। আশির দশকে তাহাদের নাগরিকত্ব সম্পূর্ণ হরণ করিয়া নেওয়া হয়।

আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অব্যাহতভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুটি তুলিয়া ধরিতেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরিয়া এই সমস্যার সমাধানের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হইতেছে না। মিয়ানমারের বন্ধু দেশগুলির প্রতি এই ইস্যুতে দেশটির ওপর চাপ প্রয়োগের কথাও আমরা বলিয়া আসিতেছি। এই মুহূর্তে চীন মিয়ানমারের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভূ-কৌশলগত কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন প্রথম হইতেই মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করিয়া আসিতেছে। এই নীতিতে এখনো তাহারা অটল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শীঘ্রই চীন সফর করিবেন। এই সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ইস্যুটি প্রাধান্য পাইবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়িতেছে। কিন্তু আমরা এখনো চীনা বেল্টে যোগদান করি নাই। এদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি প্রশ্নে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে অবস্থান গ্রহণ করিয়াছি। অথচ এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি দিন দিন উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করিয়া চলিয়াছি। সব মিলাইয়া রোহিঙ্গা ইস্যুটি আমাদের কাঁধে চাপিয়া বসিলেও আমরা তেমন কিছুই করিতে পারিতেছি না। আমরা যতই কৌশলী হই না কেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা বাংলাদেশে অনেকটা স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হইতে যাইতেছে। তাহাদের প্রত্যাবাসন যেমন বিগত সরকারগুলি করিতে পারে নাই, তেমনি বর্তমান সরকারও কতটা পারিবে তাহা নিয়া আমাদের আশঙ্কা ও সন্দেহ অমূলক নহে।