রাজনীতির মাঠে বারবার ক্ষমতাসীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা কৌশল নিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি-জামায়াত। কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন দলটির আহ্বানে সারা দেয়নি সাধারণ জনগণ। রাজনীতিতে এহেন ব্যর্থতায় সাফল্য খুঁজতে ‘গুজবে’র কৌশল নিয়েছে দলটি। তবে ডিজিটাল মাধ্যমের যুগে এতেও লাভ করতে পারেনি সরকার বিরোধী এই জোট।
রাষ্ট্র নিয়ে গুজব
গত নভেম্বরে হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে ব্যাংকে টাকা নেই। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে। তাই গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। এমনকি ব্যাংক থেকে টাকা তোলার জন্য হুড়াহুড়ি লেগেছে বলেও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিভ্রান্তিকর নানা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
আতঙ্ক যখন জেঁকে বসার উপক্রম তখন ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ‘ব্যাংকে গচ্ছিত আমানত নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশের ব্যাংকব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থায় রয়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোতে রক্ষিত আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ। এর পরও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংকের আমানত তুলে নেয়ার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক খবর প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যের কোনো সংকট নেই।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫১ বছরে কোনো ব্যাংক বন্ধ হয়নি। আশা করা যায়, আগামী দিনেও বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক বন্ধ হবে না। ব্যাংকগুলোতে জনগণের আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে।’
শুধু তাই নয় সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ নিয়েও একই রকম গুজব প্রচার করে বিএনপি ও জামায়াতের অনুসারীরা। এমনকি এনিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েও গুজব ছড়ান দলের শীর্ষ নেতারা।
গত ৮ আগস্ট এক সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশে রিজার্ভের অর্থ ফুরিয়ে আসছে। দেশ দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে।’
দেশকে বারবার শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও তুলনা করে বক্তব্য দিয়েছেন দলটির নেতারা। কিন্তু গত ২৬ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান জানান, ‘দেশের রিজার্ভ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আইএমএফের ঋণসহ দেশে রিজার্ভ আছে ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দিয়ে চলবে ৬ মাস।’
গুজবের নিশানা গ্যাস-বিদ্যুৎ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতে বড় ধাক্কা লাগে। বিশ্ব জুড়েই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ কমে আসে। দেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও উৎপাদন চলমান রাখতে জ্বালানির দাম সমন্বয় ও বিদ্যুতে রুটিন লোডশেডিং করার ঘোষণা দিয়ে জনগণকে সচেতন করে সরকার।
এই ঘোষণার পরপরই সক্রিয় হয়ে পড়ে বিরোধীদের গুজব সেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক বক্তব্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে গুজব ছড়ানো শুরু হয়।
দলটির নেতারা অনেকেই দাবি করেন, দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আর স্বাভাবিক হবে না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ডাকও দেওয়া হয়।
কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যেই আবারও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ফিরে এসেছে। এমনকি গ্যাসের সরবরাহও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমাবেশে জমায়েত নিয়ে গুজব
রাষ্ট্র নিয়ে লাগাতার গুজব ছড়ানো ছাড়াও নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও গুজবের আশ্রয় নিয়েছে বিএনপি। সম্প্রতি খুলনায় বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে দলটি। সেখানে দাবি করা হয়, তাদের সমাবেশে লাখো মানুষের জমায়েত হয়েছে।
কিন্তু একটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান সেই ছবি বিশ্লেষণ করে দেখায়, বড় জমায়েত দেখানো দুইটি ছবিই এডিট করে তৈরি করা হয়েছে।
গুজবের নিশানা পদ্মা সেতু
দেশের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো নির্মাণের শুরু থেকেই এটিকে ঘিরে বহু গুজব ছড়িয়েছে। শুরুতে ছড়ায় সেতু নির্মাণে শিশুর মাথা লাগবে এমন গুজব। শুধু তাই নয়, পদ্মা সেতু নির্মাণে একলাখ মানুষের মাথা লাগবে বলেও গুজব ছড়ানো হয়। গুজবে কান দিয়ে ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ২১ জন গণপিটুনির শিকার হন। নিহত হয় পাঁচজন। এর মধ্যে রাজধানী বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেনু (৪০) নামে এক মহিলাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। নেত্রকোনায় এক শিশুকে কলা কেটে হত্যা করে ব্যাগে ভরে মাথা নিয়ে যাওয়ার সময় সন্দেহভাজন যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা। এ ছাড়া মোহাম্মাপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুরেও ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে।
নির্মাণকাজের একেবারে শেষ পর্যায়েও সেতুতে ফেরি ও লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযানের ধাক্কা নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়।
পদ্মা সেতু নির্মাণের গুজবের সূত্রপাত ২০১৫ সালের ১ মার্চ নদীতে পশুর রক্ত ঢেলে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন কাজের উদ্বোধনের করার মধ্য দিয়ে শুরু হয়।
মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় মূল সেতুর পরীক্ষামূলক ভিত্তি স্থাপনের সময় নদীতে গরু ও খাসির রক্ত ঢালতে দেখা যায় চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। তাদের বিশ্বাস, বড় কাজের শুরুতে পশু উৎসর্গের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়, এড়ানো যায় বড় দুর্ঘটনা। কিন্তু সেই সময়ের পশুর রক্তের ছবি ২০১৯ সালে হঠাৎ করে মানুষের রক্ত বলে প্রচার করে একটি মহল। এরপরই দেশে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে এ বছরের ২৫ জুন যাত্রা শুরু করে পদ্মা সেতু।
কোভিড-১৯ এ লাখ লাখ মৃত্যু গুজব
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের সমালোচনা করে বিএনপি-জামায়াতকে নেতৃত্ব দেওয়া ড. কামাল হোসেনের জামাতা ও বিতর্কিত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান দাবি করেন, মহামারী করোনায় দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাবে।
কিন্তু সেই ঘটনার প্রায় দুই বছর চলে গিয়েছে। এখন ফলাফল সবার সামনে পরিষ্কার। অন্য দেশের তুলনায় মহামারী থেকে ক্ষতি এড়াতে সরকার কতটা আন্তরিক ভূমিকা রেখেছে সেটা জনগণ দেখেছে।
ইউনিসেফ তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ, পেরু, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইনকে 'কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের সাফল্যের গল্পে' তালিকাভুক্ত করেছে। এ ছাড়া সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ দুই ডোজ করে টিকা নিয়েছে। এ ছাড়া টিকা দেওয়ার হার দ্রুত বেড়েছে।
নিক্কেই কোভিড-১৯ রিকভারি ইনডেক্সে বাংলাদেশ বিশ্বের ১২১টি দেশের মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সূচকের সর্বশেষ সংস্করণ অনুযায়ী বাংলাদেশ ৮০ স্কোর নিয়ে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কম্বোডিয়া এবং রুয়ান্ডার চেয়ে পরে অবস্থান করছে।
ফলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরে বার্গম্যান লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যুর যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
যেভাবে পরিচালিত হয় গুজবের কর্মকাণ্ড
ফ্যাক্ট চেকিং নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দেশে হরহামেশাই ছড়িয়ে পড়া গুজবের পেছনে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী ভূমিকা রাখছে। এদের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক ইন্ধন। এরমধ্যে বেশিরভাগ গুজব প্রচারের চ্যানেলের নেপথ্যে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা ভূমিকা রাখছে।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, গুজব ভিত্তিক চ্যানেলগুলোর পেছনে কয়েক ধরণের লোকজন কাজ করছে। একটি সরাসরি বিএনপি জামায়াতের লোকজনেরা। আরেকটি হলো এদেরই সমর্থকগোষ্ঠী। যারা সম্পূর্ণ ভুয়া তথ্য দিয়ে ক্লিক বিট করে। বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখলে সকল মানুষই সেটায় ক্লিক করে তবে ভেতরে কিছুই থাকে না।
প্রতিবেদন বলছে, এসব গুজব প্রচারকারীরা বিএনপি জামাতের যারা ফটোশপ/ভিডিও এডিটিং এর কাজ সামান্য একটু জানে, সেসব নেতাকর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে এ ধরণের কাজ করে।
এসব গুজব প্রচারের অন্যতম টার্গেট থাকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। তারা ধর্মীয় ইমোশনকে ব্যবহার করে একদল মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। অনেকসময় তারা ইতিহাস বা সাম্প্রতিক খবরকে বিকৃত করে গুজব ছড়ায়। অনেক সময় সরাসরি মিথ্যাচার করে গুজব ছড়ায়। অনেক সময় দেখা যায় অনেক আগের কোনো ছবিকে বর্তমান সময়ে ছবি বলে চালিয়ে দেয়।
“একটা গুজব খুব দ্রুত ছড়িয়ে যায়। আর এই পোষ্টগুলো এমনভাবেই করা হয় যাতে অনেক তাড়াতাড়ি ভাইরাল হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেটি সরানো হয় ৫/৬ ঘন্টা পর। ততক্ষণে যার ক্ষতি হওয়ার সেটা হয়েই যায়।”
এসব অপপ্রচারের একটা অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সরকারকে বিপাকে ফেলা। এর মূলে রয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদী এজেন্ডা প্রচারের চেষ্টা। যা বাস্তবায়নে তারা পাবলিক বাসে আগুন জ্বালিয়ে, জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারার মতো কাণ্ড করেছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। এখন তাদের অন্যতম বড় আশ্রয় গুজব। ফলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের এসব গুজব দমন ও ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ এসব গুজব শুধু সরকারের ক্ষতি করে না বরং সাধারণ মানুষের জানমালের জন্যও এটা বড় হুমকি।
লেখক: সৈয়দ ইমাম বাকের
পাঠাগার সম্পাদক,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।