কাতার বিশ্বকাপ ও ডান-বামের সাংস্কৃতিক পার্থক্য 

‘প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতি আছে। আমরা সেটিকে স্বাগত জানাই এবং সম্মান করি। আমরা চাই অন্যরাও আমাদের জন্য একই কাজ করুন।’ কাতার বিশ্বকাপ-২০২২ আয়োজনে গঠিত সর্বোচ্চ কমিটির ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি ইয়াসির আল-জামাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথার ওপরই জোর দেন।

বিশ্বকাপের শুরুতে, বিশেষ করে নারী, সমকামী মানুষ ও অভিবাসী শ্রমিকদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কাতারের ওপর দিয়ে বয়ে যায় সমালোচনার ঝড়।  কাতার সরকারের সমর্থক এবং যারা পশ্চিমা নীতি-নৈতিকতা ও ঔপনিবেশিক মিথে বিশ্বাসী এবং গত্বাঁধা প্রাচ্যবিদ, তাদের উভয়ের পক্ষ থেকে সমালোচনার তির নিক্ষেপ করা হয়। অবশ্যই কাতারের বিরুদ্ধে এই সমালোচনায় রয়েছে ভণ্ডামি ও বর্ণবাদের বীজ। তবে কাতারকে রক্ষা করার জন্য এটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। অথবা এর সংস্কৃতি এবং আরো কিছুর জন্য ‘সম্মান’ প্রকাশের মাধ্যম বানানোও অনুচিত।

আল-জামাল যাকে কাতারি সাংস্কৃতিক বিশ্বাস বলে মনে করেন এবং বিশ্বের বাকি লোকদের দ্বারা যাকে স্বাগত ও সম্মান জানাতে হবে, তা অনেক কাতারি নিজেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেননা, কাতারেও সমকামী, লেসবিয়ান ও রূপান্তরকামী লোকের বসবাস রয়েছে। তারা জেল ও মৃত্যুর ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে। কারণ তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক জগত্ কর্তৃপক্ষের দ্বারা স্বীকৃত ও সম্মানিত নয়, বরং তারা নির্মমভাবে দমন-পীড়নের শিকার।  

হাজার হাজার কাতারি নাগরিক নারীর সমান অধিকারকে স্বাগত ও সম্মান জানানোর বিষয়টিকে অস্বীকার করেন না। এমনকি ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তারা হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের প্রতি নৃশংস আচরণের পক্ষপাতী নন। পশ্চিমা উদারপন্থিরাই প্রথম এ বিষয়গুলো উত্থাপন করেননি, বরং নির্যাতিত কাতারের মানুষ ও শ্রমিকেরা বিশ্বব্যাপী তাদের দাবি ছড়িয়ে দিয়েছে। কাতারি কর্তৃপক্ষের দ্বারা সংজ্ঞায়িত কাতারি সংস্কৃতিকে ‘সম্মান’ করলে আমরা এসব লোকের সঙ্গে কি বিশ্বাসঘাতকতা করি না?

সংস্কৃতি স্থির, সমজাতীয় সত্তা নয়, কিন্তু ভেতর থেকে ছিদ্রযুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। সাংস্কৃতিক সম্মান সম্পর্কে আজকের আলোচনার বেশির ভাগই সংস্কৃতির মধ্যে বৈচিত্র্য ও দ্বন্দ্বকে উপেক্ষা করে চলে। এটি ক্ষমতাবানদের একটি ‘প্রমাণিত’ সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার উপায় হয়ে উঠেছে। কাতার নিয়ে তাৎক্ষণিক বিতর্কের বাইরেও ‘সর্বজনীনতাবাদী’ ও ‘সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকদের’ মধ্যে গভীর সংঘাত রয়েছে। একদিকে যারা জোর দেন যে সাম্য, গণতন্ত্র ও সহনশীলতার মতো কিছু সার্বজনীন নিয়ম রয়েছে, যা সমস্ত সমাজের মেনে চলা উচিত; অন্যদিকে তারা যুক্তি দেন যে, প্রতিটি সংস্কৃতির নিজস্ব মূল্যবোধ এবং আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা তার নিজস্ব শর্তে সম্মান করা উচিত। তবে সর্বজনীনতাকে অনেকে জাতিকেন্দ্রিকভাবে কেবল ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

এটি অনেক বেশি জটিল বিতর্ক। একটি ঐতিহাসিক ও হাস্যকর দৃষ্টিভঙ্গি হলো, সর্বজনীনতার ধারণা শুধু ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ। যদিও ইউরোপীয় শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমেই এটি বিকশিত ও প্রসারিত, যখন সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার অনেক ধারণা ইউরোপীয় রোম্যান্টিসিজমের মধ্যে তাদের শিকড় খুঁজে পায়। ১৮ শতকে এনলাইটমেন্ট তথা আলোকিতকরণের মাধ্যমেই সমতা ও সর্বজনীন অধিকারের ধারণাগুলো ইউরোপীয় চিন্তাধারার একটি কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। যদিও এটা ছিল দাসত্ব ও ঔপনিবেশিকতার যুগ। অনেক আলোকিত দার্শনিক বর্ণবাদী মনোভাবের পরিচয় দিয়ে সমতা ও সর্বজনীনতার প্রতিরক্ষা ও দাসত্বের স্বীকৃতি এমনকি সমর্থনকেও এক করে দেখেছেন। সর্বজনীনতাও ঔপনিবেশিকতার একটি অস্ত্র হয়ে উঠেছিল বাড়াবাড়ির কারণে। কেননা, তাদের ধারণা ছিল, সভ্যতা রক্ষার খাতিরেই ইউরোপীয় দেশগুলোর অ-ইউরোপীয় বিশ্বকে শাসন করতে হবে।

ইউরোপীয় এবং আরো ব্যাপকভাবে বলতে গেলে পশ্চিমা কর্তৃপক্ষ সর্বজনীনতার ধারণাকে যে নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করেছেন, শুধু তার কারণে বিশ্বের যে কোনো প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে এর তাৎপর্যকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। এনলাইটেনমেন্ট নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রেও এর সমর্থক ও সমালোচক উভয়েই এটিকে একটি অনন্য ইউরোপীয় ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। একজনের জন্য এটি ইউরোপের মহত্ত্বের একটি প্রদর্শনী; অন্যের জন্য একটি অনুস্মারক, যার আদর্শ বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদ দ্বারা কলঙ্কিত। উভয়েই সেই আদর্শের অনেকগুলোকে রূপ দিতে অ-ইউরোপীয় বিশ্বের গুরুত্বকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন না। 

যদিও যারা এনলাইটেনমেন্টের ঐতিহ্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন যে ‘সব পুরুষ সমানভাবে সৃষ্টি হয়েছে’ তারা দাসপ্রথা ও ঔপনিবেশিকতাকে সমর্থনের পক্ষপাতী ছিলেন। অথচ এটি দাস, ঔপনিবেশিক প্রজা, শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ ও নারীর সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছিল। এর মাধ্যমে নিজেদের মুক্ত করার জন্য সাম্য ও সর্বজনীনতার ধারণাগুলোকে একটি পূর্ণ অর্থ দেওয়া হয়েছিল। সর্বজনীনতা হয়তো আলোকিতকরণের একটি পণ্য হতে পারে, তবে এটি উভয়েই একটি অস্ত্র ছিল এবং ইউরোপীয় শাসনের বিরুদ্ধে ও অভিজাতদের দ্বারা আরোপিত বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে সংগ্রামকারীদের মাধ্যমেই তার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। 

ইতিমধ্যে সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়। এর পেছনে মূল ব্যক্তিত্ব হলেন জার্মান রোম্যান্টিক দার্শনিক জোহান গটফ্রাইড হার্ডার, যার সংস্কৃতির ধারণা আজও অনেক চিন্তাভাবনাকে আকার দিয়ে চলেছে। হার্ডারের মতে, যা প্রতিটি মানুষ বা জাতিকে অনন্য করে, তা হলো এর সংস্কৃতি :এর বিশেষ ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস এবং জীবনযাপনের পদ্ধতি। প্রতিটি জাতির স্বতন্ত্র প্রকৃতি তার জাতিয়তাবাদের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, ইতিহাসের মাধ্যমে পরিমার্জিত হয় মানুষের আত্মা। সেই জাতির সদস্য হওয়ার জন্য সেই জাতির দেওয়া উপায়ে চিন্তা ও কাজ করতে হয়। একটি সংস্কৃতিকে কেবল তার নিজস্ব শর্তেই বোঝা যায় এবং প্রতিটি সংস্কৃতিকে প্রামাণিক রাখতে হলে একে বাইরের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে হবে।

হার্ডার ছিলেন সমতার কট্টর সমর্থক এবং দাসত্ব ও উপনিবেশবাদের ঘোর বিরোধী। তা সত্ত্বেও তার সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা এবং তার সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতার উদযাপন তাকে ঘৃণ্য ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নিয়ে যায়। তিনি অভিবাসন ও মিশ্র বিবাহকে ঘৃণা করতেন, যেগুলোকে তিনি ‘একজন মানুষের স্বতন্ত্রতার জন্য দৃঢ়ভাবে ক্ষতিকর’ বলে ভেবেছিলেন।

আজ বাম ও ডান উভয়েই হার্ডারের ধারণাগুলোর মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন। তারা সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং বাইরের হস্তক্ষেপ ও দখল থেকে নিজেদের রক্ষা করে স্বতন্ত্র সংস্কৃতির ‘সত্যতা’ বজায় রাখার ইচ্ছা পোষণ করছেন। অভিবাসন বা বিশ্বায়ন যা-ই হোক না কেন, কোনো ক্ষেত্রেই তারা ছাড় দিতে নারাজ। 

কাতারের সমালোচনার বিরুদ্ধে পালটা সমালোচনার আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো ডানপন্থি ব্যক্তিদের প্রাধান্য, যাদের স্বাভাবিক লক্ষ্যবস্তু হলো ‘জাগ্রত’ বাম। আমেরিকান খ্রিষ্টান রক্ষণশীল রড ড্রেহার, ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেরিন লে পেন ও ভিক্টর অরবানের নেতারা কাতারের প্রতি পশ্চিমা ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের’ নিন্দা করেছেন এবং এর মাধ্যমে পশ্চিমা উদারপন্থিদের ঘৃণ্য ঔদ্ধত্যকে উসকে দিয়েছেন। এটা আজকের রাজনীতির বিভ্রান্তির একটি দিক যে কখনো কখনো বাম ও ডানের সাংস্কৃতিক যুক্তিকে আলাদা করা কঠিন।

এখানে সর্বজনীনতার ধারণাকে অবশ্যই প্রতিক্রিয়াশীল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। যা হোক, সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার শ্যাওলাময় ধারণায় সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে আমরা এই প্রতিক্রিয়াশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছি না। তবে শুধু সর্বজনীনতাবাদের আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ পুনরুদ্ধার করে ইউরোপে হোক বা কাতারেই হোক, সবার অধিকার রক্ষা করতে হবে আমাদের।

লেখক : একজন অবজারভার কলামিস্ট 
ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম