নৈতিকতা, পড়াশোনা, শিক্ষাদান ও উপস্থিতিসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুধু একটি বিদ্যালয়কে ঘিরে বদলে গেছে প্রত্যন্ত গ্রামের জনপদ। শিশুবান্ধব, প্রাকৃতিক ও স্বপ্নীল পরিবেশে গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টি শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে সারাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা চালু হলে প্রাথমিক শিক্ষার মান বদলে যাবে।
জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষাক্ষেত্রে একটি আদর্শ বিদ্যালয়ের প্রতিচ্ছবি। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫২ সালে। শিক্ষাপদ্ধতি, নিয়মনীতি সবকিছুতে রয়েছে ভিন্নতা। তবে ২০০৮ সাল পর্যন্তও এই বিদ্যালয়ের অবস্থা ছিল শোচনীয়। উপজেলার মধ্যে ফলাফল বিপর্যয়ে শীর্ষে থাকায় ২ বছর বন্ধ থাকে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি। ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মো. মনিরুজ্জামান। এরপর থেকেই বদলে যেতে থাকে বিদ্যালয়ের পরিবেশ, ফলাফল ও নিয়ম-নীতি। শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া বেশকিছু উদ্যোগের জন্য ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে বিদ্যালয়টি।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি স্থানীয়দের সহযোগিতায় বদলে ফেলা হয়েছে শিক্ষার পরিবেশ। সিসিটিভি ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রিত এ বিদ্যালয়ে শিশুদের আকর্ষণের জন্য রয়েছে দোলনা, সরাৎ, ঢেঁকিকল, প্রাণী যাদুঘর, ফুলের বাগান, দৃষ্টিনন্দন পানির ফোয়ারা, সবজি বাগানসহ বিভিন্ন খেলার সামগ্রী। রয়েছে বিদ্যালয়ের নাম অংকিত পাথরের ফলক, শহীদ মিনার, বিভিন্ন মানচিত্র, সুসজ্জিত শ্রেণিকক্ষ, কার্যকর একটি মহানুভবতার দেয়াল, শিক্ষামূলক বিভিন্ন চার্ট। বিদ্যালয়জুড়ে বিভিন্ন মনীষীদের ছবি আর দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষণীয় বাণী। আছে শেখ রাসেল স্মৃতি ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, বিদ্যালয়ের ছাদে আকর্ষণীয় ফলদ বৃক্ষের সমাহার, বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অ্যাকুরিয়াম। শিশুশিক্ষার্থীরা প্রতিদিন পরিষ্কার করে তাদের ক্যাম্পাস ও বাগান।
জাতীয় সংগীত ও শপথবাক্যের পর ‘প্রতিদিন কিছু শিখি নামক’ বোর্ডের কাছে চলে যায় শিক্ষার্থীরা। প্রত্যেকে বাক্যটি পড়ে শ্রেণিকক্ষে যায়। শ্রেণিকক্ষের সামনে রয়েছে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ছবিসহ নাম, বাবা-মায়ের নাম ও মোবাইল নম্বর। কেউ অনুপস্থিত থাকলে শিক্ষকের ফোন তাৎক্ষণিক চলে যাবে অভিভাবকের কাছে। এর সবকিছুই চেয়ারে বসে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান। নানা উপকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর উজ্জীবিত করে শিক্ষা দেওয়া হয়। শিশুশ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়। ফলে তারা বাড়িতেই থাকতে চায় না।
শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার মিত বলেন, ‘বিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি অনেক খালার সামগ্রী আছে। শিক্ষকরা আদর করে মা বলে ডেকে লেখাপড়া করান।’ তাই প্রতিদিন সে বিদ্যালয়ে আসে।
শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন মিরাজ বলে, ‘এই বিদ্যালয়টি কতো ভালো, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে না আসলে ভালো লাগে না। বিভিন্ন সামগ্রীর মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হয়।’ নীতিবাক্য পড়ার মাধ্যমে তাদের ভেতর ভালো মানসিকতা তৈরি হচ্ছে বলে জানায় সে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতি খাতুন জানায়, সে আগে ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতো। বাবা-মা তাকে গ্রামে এনে স্কুলে ভর্তি করবে শুনে মন খারাপ হয়ে যায় শহরের পরিবেশ আর গ্রামের লেখাপড়া কি এক হবে, এমনটা ভেবে। কিন্তু বিদ্যালয়ে এসে সেই ধারনা পাল্টে যায়। গ্রামেই শহরের চেয়ে ভালো পরিবেশে সে লেখাপড়া করছে বলে জানায়।
শুধু খাদিজা বা মিরাজ নয়, বিদ্যালয়ের শিশু থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের পছন্দের স্কুল জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সহকারী শিক্ষক উম্মে কুলছুম বলেন, ‘আমি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আগে শিক্ষাকতা করেছি। তাছাড়া অনেক বিদ্যালয় দেখেছি। এই বিদ্যালয়ের মতো এমন সুন্দর পরিবেশ আগে দেখিনি। স্কুলের বাহ্যিক পরিবেশ, শিক্ষা উপকরণ, প্রধান শিক্ষকের স্কুল পরিচালনার কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
অভিভাবক বিপ্লব শিকদার জানান, তার ছেলে বাড়িতেই থাকতে চায় না। এমনকি শুক্র ও শনিবারও স্কুলে যেতে চায়।
মোরেলগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলিম হাওলাদার বলেন, ‘প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত এই বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে। ইউনিয়নে এমন একটি বিদ্যালয় আছে, এজন্য অনেক ভালো লাগে।’ সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এলাকাবাসীকে সম্পৃক্ত করে ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা। ভালো কোনো কিছু করলে এলকার মানুষ অবশ্যই সহায়তা করেন। শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো শিক্ষা দেওয়া হয় এখানে।’
বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. শাহ আলম জানান, একজন প্রধান শিক্ষকের সদিচ্ছা থাকলেই একটি এলাকার পরিবর্তন হতে পারে, তার জলন্ত উদাহরণ জিলবুনিয়া কামলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জেলার অন্যান্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই বিদ্যালয় পরিদর্শনে এনে বিদ্যালয়টিকে অনুকরণ করতে বলা হবে।
এই বিদ্যালয়ের আদলে সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা চালু হলে পাল্টে যাবে শিক্ষার পরিবেশ। ছোটবেলায় শিশুরা নৈতিকতার শিক্ষা গ্রহণ করে বড় হয়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিক হবে, এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।