চার সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ তিন পার্বত্য জেলার শান্তিপ্রিয় মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্য ও নির্মাণ কাজ থেকে শুরু করে কোন কিছু করতে গেলেই এই সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের দিতে হয় চাঁদা। বছরে ওই চার সংগঠনের সদস্যরা চাঁদা আদায় করছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মত। শুধু চাঁদা আদায় করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, ওই চাঁদার টাকা পাঠাচ্ছে বিদেশেও। সেখানে সেই টাকা সংগঠনের নেতাদের সন্তানদের পড়াশোনা ও বাড়ি-গাড়ি কেনার কাজেও ব্যয় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
তারা জানান, নির্ধারিত হারে চাঁদা না দিলে নির্যাতন, অপহরণ ও প্রাণহানির মত ঘটনা ঘটে। এ কারণে তাঁরা নীরবে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেও বিষয়টি অবহিত করেন না। তবে স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় জনগণ জেগে ওঠায় এক সময় এই চাঁদাবাজিও বন্ধ হয়ে যাবে। রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বেশ কয়েকটি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্রই ধরা পড়েছে এই প্রতিবেদকের কাছে।
পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি হলেও তিন পার্বত্য জেলায় চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অনেকগুলো গ্রুপ আছে। এগুলো হচ্ছে- ইউপিডিএফ (মূল), ইউপিডিএফ (ডেমোক্রেটিক), জেএসএস (মূল), জেএসএস (রিফর্মিস্ট), কেএনএফ (কুকি চিন ন্যাশনাল ফন্ট)। এছাড়া রয়েছে- ওয়াই ডি এফ (ইয়থ ডেমোক্রেটি ফন্ট), পিসিপি (পার্বত্য ছাত্র পরিষদ) ও এইচ ডব্লিউ এফ (হিল উইমেন ফেডারেশন)। কেএনএফ এর সন্ধান বান্দরবানের সাইজাম পাড়ায় পাওয়া যায়। কেএনএফ রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির শিনজিপাড়ায় চাঁদাবাজি করে থাকে। মিয়ানমার ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এমএনপি) চাঁদাবাজি করে কাপ্তাই এলাকায়। সেখানে মূল দুটি বড় সংগঠনের আধিপত্য রয়েছে। এসব এলাকার বিভিন্ন হোটেল-মোটেল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এবং কাঠ ব্যবসায়ীসহ নানা প্রতিষ্ঠান মাসে নির্ধারিত হারে চাঁদা দিয়ে থাকে উল্লেখিত সংগঠনের সন্ত্রাসীদের।
চাঁদাবাজি থেকে রক্ষা পায়না সাধারণ কৃষকরাও। এমনকি এক ছড়া কলা থেকেও চাঁদা দিতে হয়। কেবলমাত্র খাগড়াছড়ির সাজেক এলাকার ব্যবসায়ীরাই প্রতিমাসে সন্ত্রাসীদের ৩১ লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে সেখানে টিকে আছেন। শুধু চাঁদাবাজিই নয় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো শান্তি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে নানা সন্ত্রাসী কার্যকলাপও চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীর সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে সন্ত্রাসীরা ততোটা পেরে ওঠে না।
এ প্রসঙ্গে রাঙ্গামাটির এমপি দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, শান্তি চুক্তি নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলে। বিএনপিসহ কোন কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও এর সমালোচনা করা হয়। বলা হয় শান্তিচুক্তির ফলে এই তিন পার্বত্য জেলা পার্শ্ববর্তী একটি দেশের অংশ হয়ে যেতে পারে। তারা ক্ষমতায় গেলে এই শান্তিচুক্তি বাতিল করবে বলে চুক্তিবিরোধীদের আশ্বাস দিয়ে আসছে। কিন্তু আমি এই অভিযোগের কোন সত্যতা খুঁজে পাইনি। শান্তি চুক্তির ফলে এই তিন পার্বত্য জেলায় অবকাঠামোসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের ফলে জেগে উঠেছে পাহাড়ের মানুষ। আগে অনেক ভিক্ষুক ছিলো সেখানে। এখন ভিক্ষুক খুঁজে পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার কোন কার্পণ্য করেনি। কিন্তু অপরপক্ষ শান্তি চুক্তি না মেনে এই তিন জেলায় জম্মুল্যান্ড গড়ার যে স্বপ্ন দেখছে তার বাস্তবায়ন কখনোই হবে না। পার্বত্য অঞ্চল রাজনীতির মূল স্রোতধারায় অন্তর্ভুক্ত। এদেরকে কেউ আর পেছনে আটকে রাখতে পারবে না। একসময় এই চাঁদাবাজিও বন্ধ হয়ে যাবে। এই পার্বত্য অঞ্চল বাংলাদেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভূখণ্ড থেকে কোন শক্তি এই অঞ্চলকে আলাদা করতে পারবে না। পাহাড়ি জনগণ জীবন দিয়ে হলেও নিজ মাতৃভূমিকে রক্ষা করবে। সেভাবে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাদের সন্তানরা সুশিক্ষিত হচ্ছে।
রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, এই চাঁদাবাজরা একদিন পাহাড় থেকে বিতাড়িত হবে। নতুন প্রজন্ম সুশিক্ষিত হচ্ছে এবং তাদের পরিবার শান্তিতে আছে। ফলে চাঁদাবাজি করে বেশিদিন কেউ টিকতে পারবে না। নতুন প্রজন্ম পার্বত্য জেলাগুলোয় যে উন্নতি দেখছে তাদের বিপথে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই। যা বড় একটা সুখবর। তিনি বলেন, পার্বত্য জেলায় আর্থ সামাজিক অবস্থার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমান সরকার ব্যাপক উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সম্প্রীতিও অনেক বেড়েছে। কোভিডের সময় অন্যান্য জেলায় যেভাবে চিকিত্সাসহ টিকা প্রদান করা হয়েছে পাহাড়ি বাঙালিদের মধ্যেও সেভাবে চিকিৎসা ও টিকা দেওয়া হয়েছে। দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী বাসিন্দাদের মধ্যে খাবার সরবরাহসহ চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখেছে।
রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ বলেন, এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর নজরদারি করা হয়। গ্রামাঞ্চলে বিট পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কোন অশান্ত পরিস্থিতি দেখা দিলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে চাঁদাবাজির বিষয়ে ভয়ে অনেকে মুখ খোলেন না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের সভাপতি ও বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মজিবুর রহমান বলেন, এখানে ৫৪ ভাগ বাঙালি নানা হুমকির মুখে। তারা সন্ত্রাসীদের নিয়মিত চাঁদা দেন। তবে এখানে উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে সন্ত্রাসীরা পাহাড়ে জম্মুল্যান্ড গড়ার স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্ন দেখানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিদেশি ও সুশীল সমাজের ইন্ধন রয়েছে। এরা অর্থসহ নানাভাবে সহযোগিতা পাচ্ছে। চাঁদার টাকা দিয়ে নেতাদের সন্তানরা বিদেশে পড়াশোনা করেন। তবে চাঁদাবাজি ছাড়া পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে আর কোন সমস্যা নেই। তিনি বলেন, সরকার শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করলেও চুক্তির অপর পক্ষ তা লঙ্ঘন করে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
রাঙ্গামাটি শুভলং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, পাহাড়ি ও বাঙালিদের মিলে ২৭০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এখানে সেনাবাহিনীর নিয়মিত টহল থাকায় এই মার্কেটে কোন চাঁদাবাজি হয়নি। তবে আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা নিয়মিত সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিয়ে আসছে। নির্ধারিত হারে চাঁদা না দিলে অপহরণসহ নানা ধরনের নির্যাতন করে থাকে। জেএসএস ও ইউপিডিএফ এখানে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে।
স্থানীয় অধিবাসী মনিকা চাকমা বলেন, চাঁদাবাজির কারণে আমরা অতিষ্ঠ। রঞ্জন চাকমা বলেন, সরকার শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে। তবে চুক্তির অপর পক্ষ চুক্তির সঙ্গে বেঈমানি করেছে। এরা চুক্তি অনুযায়ী অস্ত্র জমা না দিয়ে তা দিয়ে পাহাড়ে চাঁদাবাজি করছে। সাবেক মেম্বার শক্তি মোহন চাকমা বলেন, চাঁদাবাজিই বড় সমস্যা। এছাড়া পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে আর কোন সমস্যা নাই।
পার্বত্য জেলার ৫০ কিলোমিটার এলাকা খুবই দুর্গম। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে নিয়মিত যেতে পারেন না। যেতে হলে তাদের কয়েকদিন সময় লেগে যায়। যদি ওই ৫০ কিলোমিটার দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্রুত উন্নতি করা যায় তাহলে পাহাড়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যাবে।
এদিকে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে একটি ব্রিজ হয়েছে, যা পদ্মা সেতু নামে পরিচিত। এই ব্রিজের কারণে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। সহজেই সেখানকার জনগণ শহরে আসতে পারে চিকিৎসা নিতে। পাহাড়িদের অনেকেই জানান, পার্বত্য জেলাগুলোতে অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে তাদের সন্তানেরা ভালো স্কুল ও কলেজে পড়তে পারছে। ফলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ছে সেখানে। তারা বলছেন, চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হলেই তারা শান্তিতে পাহাড়ে বসবাস করতে পারবেন।