মানুষের পর এবার স্থলমাইনে পায়ের গোড়ালি হারালো বুনো হাতি

বান্দরবনের নাইক্যংছড়ির বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে মানুষের পর এবার স্থলমাইন বিস্ফোরণে পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছে একটি বুনো হাতি। সীমান্ত অতিক্রমের সময় হাতিটি বিস্ফোরণের শিকার হয়। আহত হাতিটি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগ ও ওয়াইল্ড লাইফের কর্মীরা। 

শনিবার (৩ ডিসেম্বর) বিকাল থেকে নানা চেষ্টা করেও সোমবার বিকাল পর্যন্তও আহত হাতিটির চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। হাতিটি রামুর কচ্ছপিয়ার লম্বাশিয়া পাহাড়ের গহিন অরণ্যে অবস্থান করলেও সোমবার প্রকাশ্যে আসেনি। প্রথম দু'দিন আহত সঙ্গী হাতিটির চারপাশে অবস্থানে ছিল আরও পাঁচ-ছয়টি হাতি। কেউ কাছে যেতে চাইলেই তেড়ে আসে বুনো হাতির দল। ফলে শত চেষ্টা করেও বন ও ওয়াইল্ড লাইফ কর্মীরা আহত হাতির কাছেও ভিড়তে না পারায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যায়নি। তবে, এখনো বন ও ওয়াইল্ড লাইফকর্মীরা অবজারভেশনে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. আনোয়ার হোসেন সরকার।

ডিএফও বলেন, স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রাচীনকাল বুনো হাতির পাল শূন্যরেখার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের জঙ্গলে যেত আবার ফিরেও আসতো। শনিবারও আগের মতো মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশের সময় সম্ভবত শূন্যরেখার কাছে স্থলমাইন বিস্ফোরণে একটি হাতির সামনের ডান পায়ের গোড়ালি উড়ে গেছে। খবর পেয়ে শনিবার সন্ধ্যার আগে ভেটেরিনারি সার্জন ও বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আহত হাতির শরীরের ইনজেকশন পুশ করতে পারেননি। কয়েকশ গজ দূর থেকে দাঁড়িয়ে বনকর্মীরা হাতির পায়ে ক্ষত চিহ্নটি দেখতে পান। কিন্তু হাতির কাছাকাছি যাওয়া যাচ্ছে না।

রামুর বাঁকখালী বনের রেঞ্জ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ডিএফও আরও বলেন, ওইদিন বেলা ৩টার দিকে বনকর্মীরা লম্বাশিয়া পাহাড়ের গহিন জঙ্গলে আহত বুনো হাতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। রামুর গর্জনিয়া বাজার থেকে হাইস্কুল সড়ক দিয়ে লম্বাশিয়ার ওই পাহাড়ে যেতে হয়। বিকাল ৪টার দিকে চকরিয়া ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন হাতেম সাজ্জাত জুলকার নাইনের নেতৃত্বে বন বিভাগ, ওয়াইল্ড লাইফ ও সাফারি পার্কের যৌথ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত হাতিকে কয়েকশ গজ দূর থেকে ট্রাই-এঙ্গোলার দিয়ে ব্যথা কমানোর ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সফল হতে পারেননি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় চিকিৎসকসহ দলের সদস্যরা নিরাপদ স্থানে ফিরে আসেন। রোববার সকাল থেকে একইভাবে বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে হাতিটির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। 

ঘটনাস্থলে থাকা বনকর্মীরা বলছেন, আহত হাতিটি লম্বাশিয়া বনের ভেতরেই আছে। হাতির দাঁত আছে দুটো। অপর কয়েকটি হাতি ধাক্কা দিয়ে আহত হাতিটিকে গহিন জঙ্গলে দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আহত হাতিটি ঠিকমতো হাঁটতে পারছিল না। সোমবার সকাল থেকে হাতিটিকে সেই জায়গায় আর দেখা যায়নি। এরপরও বন ও ওয়াইল্ড লাইফের কর্মীরা অবজারভেশনে রয়েছে। সুযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।   

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, যুগ যুগ ধরেই বুনো হাতির পাল শূন্যরেখার সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের জঙ্গলে চলে যেত। আবার ফিরেও আসতো। বহু আগে থেকেই সীমান্তে স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ও দেশটির স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী। গত চার মাসে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিন ব্যক্তি নিহত ও পা হারিয়েছেন চারজন। হতাহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি, অন্যরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। এর আগে স্থলমাইন বিস্ফোরণে হাতি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছিল।