‘বলন-টাকু’র ইতিকথা

মো. আমিরুজ্জামান

 

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে সবকিছু। ফলে জীবনধারাতেও আসছে পরিবর্তন। গৃহস্থালির কাজসহ বিভিন্ন কাজের জন্য মোটা, চিকন, ছোট, বড় নানারকম দড়ির প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বাজারে মেশিনে তৈরি পাট ও প্লাস্টিকের নানা ধরনের দড়ি পাওয়া যায়। এক সময় এসব দড়ি তৈরি হতো ঘরে বসেই। গ্রামের প্রতিটি গৃহস্থের বাড়িতেই তৈরি হতো এসব দড়ি। দড়ি তৈরিতে প্রয়োজন হতো পাট ও বলন আর টাকু। দড়ি তৈরির মূল যন্ত্র ছিল এই বলন। এক থেকে দেড় ফুট দৈর্ঘ্যের কঞ্চির সাথে ছোট্ট একটি কঞ্চি বেঁধে বলনে হাত ঘুরিয়ে তেরি হতো সুতলি, দড়ি। এক গোছ পাটের গোঁড়ার দিকটার নিচের দিকে রেখে আগার দিকটা ঘরের খুঁটি বা আঁড়ার সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো।

পাটের অপোকৃত মোটা আঁশগুলো চিবিয়ে চিকন করে একটি একটি করে আঁশ ছিঁড়ে নিয়ে বলনের সাহায্যে পাক দিলে তৈরি হয়ে যেত সুতলি। তৈরি সুতলিটুকু বলনে জড়িয়ে রেখে আরেকটি আঁশ দিয়ে আবারো পাকানো হতো। এ সুতলি পাকানো চলতো। সুতলি পাকিয়ে বলনে জড়াতে জড়াতে এক সময় বলন ভর্তি হয়ে গেলে সুতলি আরেকটি কাঠিতে জড়িয়ে রাখা হতো। প্রয়োজনের সময় এই সুতলি দিয়ে কাজে লাগানো হতো। আর এভাবেই তৈরি হতো নানারকম দড়ি পাকানোর মূল উপকরণ সুতলি।

কাজের সুবিধার জন্য এই সুতলি দিয়ে ২ থেকে ৩/৪ ভাগ করে পাকিয়ে তৈরি করা হতো নানারকম দড়ি। এ দড়ি বেড়া বাঁধা, বস্তার মুখ সেলাই, খড়ের ঘরের চাল ও খুঁটি বাঁধা, চালের ছাউনিসহ ব্যবহার হতো নানা কাজে। ছাগল, গরু-মহিষ, লাঙল, জোয়াল ইত্যাদি বাঁধার জন্য দড়ি পাকানো হতো আরো মোটা করে। আগে বলনের তৈরি দড়ি ছাড়া গৃহস্থালির কাজ কল্পনাই করা যেত না। বৃদ্ধ মানুষ, যাঁরা মাঠে-ঘাটে কাজ করতে অক্ষম হয়ে যেতেন তাঁরা অবসর সময় বিশেষ করে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে বর্ষার সময় ঘরে বা দহলিজখানায় বসে বলনের সাহায্যে পাটের সুতলি তৈরি করতেন।

আগে গ্রামের ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে সবার বাড়িতেই বলন আর টাকু দিয়ে সুতলি তৈরি করার এ দৃশ্য চোখে পড়তো। বলনা ছাড়াও আরেকটি জিনিস দিয়ে এ সুতলি তৈরি হতো, তাঁর নাম টাকু। ৩/৪ ইঞ্চি ব্যাসের একটি কাঠ, লোহা অথবা পোড়ামাটির চাকতির কেন্দ্রে ছিদ্র করে সেখানে একটি কাঠি সংযুক্ত করে একটি একটি করে পাটের আঁশ দিয়ে দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুতলি তৈরি হতো। সেটিও এখন বিলুপ্ত।

কালের বিবর্তনে ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার ফলে বর্তমানে ঘরে বসে হাতে তৈরি এ দড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরি পাট ও প্লাস্টিকের দড়ি। মেশিনে তৈরি নানারকম দড়ি সহজলভ্য হওয়ায় বর্তমানে মাটির ঘর বিলুপ্তির কারণে চাল বাঁধার জন্য ঢ্যারা দিয়ে পাটের দড়ির দিন শেষ হয়েছে প্রায় ২ যুগ আগে। তবে গ্রামে গেলে কালেভদ্রে এখনো দু-একজন বৃদ্ধ কৃষককে বলন ও টাকুর সাহায্যে পাট দিয়ে সুতলি ও দড়ি তৈরি করতে দেখা যায়।

গৃহস্থালির কাজের জন্য দড়ি তৈরির অতি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বলন ও টাকু নামের এই জিনিসটি বর্তমান প্রজম্মের ছেলেমেয়েরা কেউ চেনে না, এমনকি এর নামও শোনেনি। অতীতের অনেককিছুর মতোই এক সময়ের গৃহস্থালির কাজের অন্যতম উপকরণ পাট থেকে সুতলি বা দড়ি তৈরি করার যন্ত্র বলন আর টাকু নামের এই জিনিসগুলো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।