আসিফুর রহমান সাগর
ভালো চিকিত্সক হিসেবে নাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মানবদরদী চিকিত্সক পাওয়া তো এখন ভাগ্যের ব্যাপার, সেখানেও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় মানুষের মুখে মুখে। তবে এ সবকিছু ছাড়িয়ে বিশ্বে চিকিত্সাশাস্ত্রে বাংলাদেশের নামকে যিনি পরিচিত করে তুলেছেন তিনি ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। চিকিত্সাশাস্ত্রে বিশ্বে তিনি বাংলাদেশের দূত। ভারতের স্বনামধন্য প্রকাশকরা তাঁর একে একে মোট ৭টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। যা উপমহাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া ও ইউরোপে। ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, সৌদিআরবসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের চিকিত্সাশাস্ত্রের পোস্ট গ্রাজুয়েট ও আন্ডার গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীরা পড়েন তাঁর বই। আর ইউরোপের স্পেন, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে পড়ানো হয় ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর চিকিত্সাশাস্ত্রের বইগুলো।
শুধু তাই নয়, এ শতাব্দির শুরু দিকে দেশে যখন ডেঙ্গু জ্বর একটি আতঙ্কের নাম তখন জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসংখ্য রোগীকে সফলভাবে চিকিত্সা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত চিকিত্সাবিষয়ক বইগুলো দেশে-বিদেশে বেশ সমাদৃত। শুধু চিকিত্সা দিয়েই নয়, সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন জার্নালে লেখালেখির মাধ্যমেও ওষুধের ভুল ব্যবহার, অপচিকিত্সার কুফল, চিকিত্সক ও রোগীর সম্পর্ক নিয়ে সারাবছরই তাঁর কলম থাকে সক্রিয়।
ভারতে চিকিত্সা বই প্রকাশের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জেপি ব্রাদার্স মেডিকেল পাবলিশার্স ও এলসেভিয়ার তাঁর বইগুলো প্রকাশ করেছে। প্রথম বইটি লিখেছিলেন ১৯৯৮ সালে। ‘শর্ট কেসেস ইন ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’ (৬ষ্ঠ সংস্করণ) বইটি খুব পছন্দ করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর একে একে লিখেছেন ‘রেডিওলজি ইন মেডিক্যাল প্র্যাকটিস’ (৫ম সংস্করণ), ‘লং কেসেস ইন ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’ (২য় সংস্করণ), ‘কেস হিস্ট্রি অ্যান্ড ডেটা ইন্টারপ্রিটেশন অফ মেডিক্যাল প্র্যাকটিস’ (৩য় সংস্করণ), ‘ইসিজি ইন মেডিক্যাল প্র্যাকটিস’ (৪র্থ সংস্করণ), ‘প্র্যাকটিক্যাল ম্যানুয়াল ইন ক্লিনিকাল মেডিসিন’ এবং এ বছর প্রকাশিত হয়েছে ‘প্র্যাকটিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড প্রেসক্রাইবার’।
এছাড়া তিনি বাংলাতেও লিখেছেন দুটি গ্রন্থ। ‘স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্বাচিত কলাম’ ও ‘সুস্থ শরীর সতেজ মন সুন্দর জীবন’। এসবেরর পাশাপাশি ৪২টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে।
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন এই চিকিত্সক।
তবে লেখক হিসেবে এই খ্যাতিকে একেবারেই পাত্তা দিলেন না ডা. আব্দুল্লাহ। বলেন, ‘জীবনে পুরস্কার সম্মান পেয়েছি অনেক। কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। সারাজীবন ছাত্রদের ভালোবাসা পেয়েছি, রোগীদের সেবা দিতে পেরেছি।’
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বিএসএমএমইউ-এর তিনবারের নির্বাচিত ডিন, মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান। শর্ট কেসেস ইন ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বইটি ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশনে ২০১৩ সালে পুরস্কৃত হয়েছে। ২০১৬ সালে চিকিত্সা সেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে পদক। এছাড়াও চিকিত্সাশাস্ত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেছেন বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার, বাংলার দর্পণ সম্মাননাসহ আরো অনেক পুরস্কার।
এসবের পাশাপাশি তিনি গাজীপুরের শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া তিনি ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্স ও পপুলার মেডিকেল কলেজের গভর্নিং কমিটির সদস্য। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার হাড়িয়াবাড়ি নিজের গ্রামের বাড়িতে নিজ জমিতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছেন। গত ১৫ বছর ধরে হাফিজিয়া মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন ব্যক্তিগত খরচে। নির্মাণ করেছেন মসজিদ।
অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ ১৯৭৮ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৮৪ সালে সৌদিতে যান চিকিত্সক হিসেবে চাকরি নিয়ে। ৫ বছর ছিলেন সেখানে। লোভনীয় সেই চাকরি ছেড়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ১৯৯২ সালে লন্ডনে যান। লন্ডনের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। সেসময় সুযোগ পান কিছু ভালো হাসপাতালে প্রশিক্ষণের। পাস করার পর বাইরের দেশে যাওয়ার লোভনীয় অফার ছিল। কিন্তু তিনি দেশে চলে আসেন দেশের মানুষকে সেবা করার ব্রত নিয়ে। ১৯৯৫ সালে তত্কালীন পিজি হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।