এম এ আলআমিন
হংকংয়ে ৯ জুন ১০ লাখের বেশি মানুষ প্রতিবাদ মিছিল করেছে। চীনের স্বায়ত্তশাসিত বিশেষ অঞ্চলটিতে ৩০ বছরের মধ্যে এত বিশাল মিছিল আর হয়নি। ১২ জুন হংকংবাসী আবারো পথ নামে। সবকিছু মিলে পরিস্থিতি ২০১৪ সালের আমব্রেলা মুভমেন্টের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। তারা এদিন আইনসভা ভবন ঘেরাও করে। বিক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও মরিচের গুঁড়ো ব্যবহার করে। এর আগে ২৮ এপ্রিল ব্যাংককের ব্যস্ততম এলাকায় এক লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিল।
এসব ঘটনা থেকে এটি পরিষ্কার যে কর্তৃপক্ষ ও জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের ধূমায়িত ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। সর্বশেষ এ বিক্ষোভের সূত্রপাত একটি আইনের খসড়াকে কেন্দ্র করে। ঐ আইনে কর্তৃপক্ষ চাইলে যে কাউকে চীনের মূল ভূখণ্ডে পাঠাতে পারবে বলা হয়েছে। হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম অবশ্য যেভাবেই হোক আইনটি পাস করিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিক্ষোভ প্রতিবাদের মুখে আইনটি পাস করার প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত আছে। যদিও এতে পরিবর্তন আনার মতো নমনীয়তা কর্তৃপক্ষ এখনো দেখায়নি। প্রত্যর্পণ আইনটি চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে আইনসভায় প্রথম উত্থাপিত হওয়ার পর থেকে এর পক্ষে বিপক্ষে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। আইনটি একবার পাস হয়ে গেলে হংকংয়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ এমন জটিলতার দিকে মোড় নেবে যা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না। বিষয়টি ক্যারি লাম যে অবহিত নন তা নয়। কিন্তু তারপরও তিনি বিক্ষোভকে খুব একটা গা করছেন না।
তাইওয়ানে এক ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া তৈরির কাজে হাত দেয়। হংকংয়ে যে চীনপন্থিরা ক্ষমতায় আছে তাই তাদের কাছেও তাইওয়ান পৃথক দেশ হিসেবে স্বীকৃত নয়। এ কারণে ওই ব্যক্তিকে তাইওয়ানে পাঠানো যায়নি। এরপরই কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে এবং চীনের মূল ভূখণ্ডেও যেন কাউকে পাঠাতে আইনি বাধা না থাকে সে উদ্যোগ নেয়। উল্লেখ্য ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকং ১৯৯৭ সালের ৩০ জুন চীনের কাছে ফিরিয়ে দেয় হয়। চীনের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হলেও হংকং ‘একদেশ দুই ব্যবস্থা’র আওতায় এতদিন বিশেষ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে এসেছে। প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে হংকংয়ে চীনের আইনি পরিসীমা সম্প্রসারিত হবে। হংকং থেকে তখন যে কাউকে চীনে পাঠানো যাবে। তার সেখানে গোপন বন্দি শিবিরে আটক রাখা থেকে শুরু করে গোপন বিচারের মতো যে কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
নতুন আইন হংকংয়ে আইনের শাসনের অবসান ঘটাবে। হংকং যে বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব তার অন্যতম কারণ এর নিজস্ব আইন ও বিচার ব্যবস্থা। কোনো কারণে এর বিলুপ্তি ঘটলে বড় বড় কোম্পানিগুলো হংকং ছড়াতে পারে। তাই প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে জমে ওঠা প্রতিবাদ এখন আর শুধু রাজনীতির ইস্যু নয়, রক্ষণশীল ব্যবসায়ীরাও এখন এ ইস্যুতে মাঠে নেমেছেন।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য হংকংয়ের জনতাকে কেবল তাদের কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না, তাদের এ দ্বন্দ্ব মূলত বেইজিংয়ের সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই এ আন্দোলন সফল হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট কম। ২০১৪ সালের আমব্রেলা মুভমেন্ট সফলতার মুখ দেখেনি। আন্দোলনকারীরা তখন অধিকতর গণতন্ত্র ও সংস্কারের দাবিতে হংকংয়ের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলো মাসের পর মাস দখল করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের শূন্য হাতেই ঘরে ফিরে আসতে হয়েছে। এবারের আন্দোলনও যদি সে রকম পরিণতি বরণ করে তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
হংকংয়ের বিষয়ে বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। পার্ল রিভার ডেল্টায় বেইজিংয়ের গ্রেটার বে এরিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। এর মধ্যে হংকং, ম্যাকাওসহ মূল ভূখণ্ডের নয়টি এলাকাকে একীভূত করা হবে। তা করা হলে হংকং স্বকীয়তা হারাবে এবং চীনের মূল অংশ থেকে এর আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য থাকবে না। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে হংকংকে চীনের আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তবে হংকংয়ের জনতাও বিষয়টিকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে এবার মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। এখন যেসব প্রতিবাদ মিছিলগুলো হচ্ছে তাতে সব পেশার এবং প্রায় সব বয়সের নারী-পুরুষ অংশ নিচ্ছে। চীনের ভিন্ন মতাবলম্বীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে একসময় হংকং গণ্য হতো। তবে চীনের স্বায়ত্তশাসিত বিশেষ অঞ্চলটির ভবিষ্যত্ শেষ পর্যন্ত কোন্ দিকে মোড় নেবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।