স্বাধীনতা যুদ্ধের ১৩ ডিসেম্বর

ভয়াল স্মৃতির সঙ্গে আক্ষেপও রয়ে গেছে গঙ্গাচড়ায়

‘কোনো লোকজন ছিলো না। আমি একাই বাবার বুলেটবিদ্ধ লাশ ঘাড়ে করে নিয়ে যাই বাড়িতে। ১৩ ডিসেম্বর আসলেই মনে পড়ে যায় সেই ভয়াল স্মৃতি। স্বাধীনতার এত বছর পর পর্যন্ত কেউ আমাদের শান্তনা দিতেও আসেনি। মেলেনি সরকারি কোনো স্বীকৃতি।’ কথাগুলো বলছিলেন গঙ্গাচড়ার পাকিস্তানি হানাদারদের ব্রাশফায়ারে নিহত সহিদার রহমানের ছেলে মহুব আলী।

এভাবেই ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাক সেনাদের হাতে হত্যাযজ্ঞের স্বীকার হন গঙ্গাচড়ার ১৭ জন নিরীহ মানুষ। স্বাধীনতার এত বছর পরও গঙ্গাচড়ায় নিহতদের স্মরণে গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতিসৌধ, আসেনি ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম; যা আক্ষেপ হিসেবে রয়ে গেছে। তবে ভয়াল সেই স্মৃতি আজও কাঁদায় গঙ্গাচড়ার মানুষকে।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার শংকরদহ গ্রামে ঘটেছিল এক নির্মম হত্যাকাণ্ড। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদরদের সহযোগিতায় পাক হানাদার বাহিনীর বুলেটে নির্মমভাবে নিহত হন ১৭ জন নিরীহ গ্রামবাসী। এদের মধ্যে মসজিদে নামাজরত অবস্থায় পাক সেনারা ব্রাশফায়ার করে মেরেছে ৬ জনকে, চলতি পথে গুলি করে মেরেছে ১০ জনকে এবং বেওনেট চার্জ করে মেরেছে ১ জনকে।

১৯৭১-এর ১২ ডিসেম্বর সকালবেলা কোম্পানি কমান্ডার মীর আব্দুস সালামের নেতৃত্বে বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গঙ্গাচড়া থানা আক্রমণ করে। তার আগেই পাক সেনারা পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা থানা ব্যারাক থেকে কিছু অস্ত্র-গোলাবারুদসহ একজন পাকিস্তানি বাবুর্চিকে ধরে নিয়ে যান তিস্তা নদীর অপর প্রান্তে মুক্ত এলাকায়। এ খবর পেয়ে পরদিন রংপুর সেনানিবাস থেকে একদল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গঙ্গাচড়ায় চলে আসে। ক্ষিপ্ত সৈন্যরা ব্রাশফায়ার করতে করতে তিস্তা নদীর তীরবর্তী শংকরদহ গ্রাম পর্যন্ত যাওয়ার পথে গঙ্গাচড়ার মফিজ উদ্দিন, ফজর উদ্দিন, আব্দুল আজিজ ও হবিবর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে।

ওইদিন বিকেলে এলাকার শান্তি কামনায় বকুলতলা পুরাতন মসজিদে নফল নামাজ আদায় করছিলেন মহিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৌলভী তৈয়ব আলী, বছির উদ্দিন, সহির উদ্দিন, মহির উদ্দিন, নবির উদ্দিন ও তার ৭ বছরের ছেলেসন্তান। নরঘাতকরা মসজিদ আক্রমণ করে নামাজরত অবস্থায় ব্রাশফায়ার করে ৬ জনকেই হত্যা করে। নামাজে দাঁড়ানো অবস্থায় তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

নিহত মৌলভী তৈয়ব আলীর ভাতিজা মুক্তিযোদ্ধা ওবায়দুল্লাহ বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে স্থানীয় পাকিস্তানি দোসরদের ইঙ্গিতে সেদিন মসজিদে আমার চাচাসহ সকল মুসল্লিদের হত্যা করা হয়েছে। একসময় পাক সেনারা রজনীকান্তের বাড়িতে প্রবেশ করে নারী নির্যাতন চালাতে থাকে। এর কঠোর প্রতিবাদ জানায় পেশিশক্তির অধিকারী রজনীকান্ত। বেশ কিছুক্ষণ ধরে হায়েনাদের সাথে ধস্তাধস্তি হয় তার। অবশেষে বেওনেট চার্জ করে হত্যা করা হয় রজনীকে।

স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিলেন তিস্তার অপর প্রান্তে লক্ষীটারী ইউনিয়নের ইছলি চরে। ১২ ডিসেম্বর রাতে তারা খবর পান, পাক সেনারা গঙ্গাচড়া আক্রমণ করবে। এস এম মনিরুজ্জামান বাবলুর নেতৃত্বে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নদী পার হয়ে মহিপুরে পৌঁছান ১৩ ডিসেম্বর সকালে। পাক সেনারা গঙ্গাচড়া লক্ষীটারীর সীমানা গান্নারপাড়ে পৌঁছালে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ।

এ যুদ্ধে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আব্দুল আজিজ, আব্দুল সালাম, সিরাজুল ইসলাম, মজিবর রহমান, সামসুল আলম, রওশোনুল হক, ছাদেকুল ইসলাম, মহুবর রহমান, আব্দুল হামিদ প্রমুখ অংশ নেন। টানা কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধ শেষে পাক সেনারা শংকরদহ মসজিদে চালায় হত্যাযজ্ঞ। এরপর তারা আবারও ব্রাশফায়ার করতে করতে এলাকা ত্যাগ করে। এ সময় তাদের রাইফেলের বুলেটে হত্যাযজ্ঞের শিকার হন মুন্সি মঞ্জুম আলী, রহিম উদ্দিন, আকবর আলী, সহিদার রহমান, বদিউল ইসলাম ও আলী মাস্টার। শিয়াল-শকুনে ঠুকরে ঠুকরে খেয়েছিল ১৭ জন নিরীহ মানুষের লাশ।

সরেজমিনে নিহত নিরীহ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের অবস্থা জানতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাই-বোনসহ অন্য সদস্যরা দিনমজুরি, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে জীবন-যাপন করছেন। বছরের পর বছর বিভিন্ন জায়গায় ধর্না দিয়েও কোনো ফল পাননি তারা। স্বাধীনতার ৪০ বছর অতিক্রান্ত হলেও তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসেনি। দিনের পর দিন অভাব আর দারিদ্রতা তাদের ধাওয়া করে ফিরছে।

নিহত সহিদার রহমানের দুই ছেলে মনাহার ও মহুব আলী তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধের গান্নারপাড় এলাকায় আশ্রয় নিয়ে দিনমুজরি করেন। ভয়াল সেই দিনের কথা তুলতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন তারা। নিহত বদিউল ইসলামের ছেলে ফজলার রহমানও বাঁধের বাসিন্দা। মাছ বিক্রি করেন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতার এত বছরে তাদের কেউ শান্তনা দিতেও আসেনি।

ভয়াল সেই সময়ে পাক সেনাদের সাথে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম, মজিবর রহমান ও সামসুল আলম জানান, দেশ স্বাধীনের পর নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোকে সহায়তা করেনি কেউ।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আজিজুল ইসলাম বলেন, গঙ্গাচড়ায় যথাযোগ্য মর্যাদায় ১৩ ডিসেম্বর পালনসহ নিহত ১৭ জনের স্মৃতি রক্ষার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা উচিৎ। গঙ্গাচড়াবাসী ১৭ জনকে হারানোর স্মৃতিময় এ দিনটি ভুলতে পারবে না।

তিনি বলেন, সময়ের ব্যবধানে সর্বনাশা তিস্তার করাল গ্রাসে বিলীন হয়েছে স্মৃতিবিজড়িত সেই শংকরদহ গ্রামটি। মর্মান্তিক ঘটনার স্বাক্ষী বকুলতলা পুরাতন মসজিদটিও আজ আর নেই। এ গ্রামের মানুষ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও তাদের হৃদয়ে সেই মসজিদসহ ১৯৭১-এর ১৩ ডিসেম্বরের ঘটনা চিরউজ্জল হয়ে আছে।