১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে মাঘের তীব্র শীতের মধ্যে চোখ বেঁধে বাসা থেকে তুলে নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা হত্যা করে। গত ১০ ডিসেম্বর ছিল তার শাহাদতবার্ষিকী। সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অবসর গ্রহণকালে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর সাফাই গেয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কোনো ভুল বা ত্রুটির কারণে পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া হয়নি। সেটা ছিল রাজনৈতিক নেতাদের অযোগ্যতা। অর্থাৎ পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের মধ্যে এখনো ’৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার ব্যাপারে কোনো অনুশোচনা বা বিবেকের দংশন অনুভব করতে দেখা যায় না। আর তাদের এদেশীয় দোসররা যখন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সদা তৎপর, তখন আমাদের অতীতকে আমাদের হৃদয়ে চিরজাগরূক রাখার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। পাকিস্তানি অপশাসন শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ’৭১-এ যারা বাংলাদেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের মধ্যে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন একটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র পাঁচ দিন আগে স্বাধীনতার শত্রু পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের জামায়াতি দোসররা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে গভীর রাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বাধীনতার উষালগ্নে তারা বহু বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে একইভাবে হত্যা করে। পরাজয়ের মুহূর্তে পাকিস্তানি ও তাদের এদেশীয় দালালদের বুদ্ধিজীবী হত্যার এই ভয়াবহ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল—বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তারা যেন দেশ চালাতে না পারে। তাদের সে চক্রান্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সাংবাদিক হিসেবে সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন আপসহীন নির্ভীক সত্যনিষ্ঠ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। অন্যদিকে অসহায় দুঃখী মানুষের জন্য তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। মানুষের দুঃখ-কষ্টে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যে কোনো প্রান্তর থেকে বহু হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ তার কাছে আসত এবং তিনি তাদের অভাব-অভিযোগের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তারপর তিনি তাদের কথা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পত্রিকার পাতায় ছেপে দিতেন। দরিদ্র অবহেলিত মানুষ তার মধ্যে পেয়েছিল সত্যিকারের একজন বন্ধু এবং নিজেদের মানুষ। জনাব হোসেন স্বাধীনতাযুদ্ধের এক বছর আগে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি ও পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি অপশাসন, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রামাণ্য দলিলস্বরূপ ‘‘Days Decisive’ নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থের ভূমিকায় আবুল মনসুর আহমদ লিখেছিলেন, ‘His Presentation of facts and documents and their analysis have been quite correct and objective but not without subjective outpouring of patriotic heart and tormented soul representative of suffering millions.’
’
শুধু ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ নয়, এ দেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জেহাদে তার ভূমিকা ছিল অসাধারণ। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় ইত্তেফাকের পাতায় দাঙ্গার বিরুদ্ধে যেভাবে তিনি কলম চালিয়েছিলেন, তা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে ছিল একটি মাইলফলক। তিনি একদিন এই দাঙ্গার বিরুদ্ধে লিড নিউজের হেডিং দিয়েছিলেন ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’। সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও প্রগতিশীল রাজনীতিকদের ভূমিকাও ছিল অনন্য সাধারণ।
ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশঙ্কাজনকভাবে ছেলে চুরি হতে থাকে। ইত্তেফাকের পাতায় সেসব সংবাদ ছাপা হতে থাকে। সংঘবদ্ধ শিশু অপহরণকারী দল এই ঘটনার পশ্চাতে সক্রিয় বলে অনেকেরই ধারণা। ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য ময়মনসিংহে দুজন রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফার পাঠালেন। সিরাজুদ্দীন হোসেনের এবং ঐ রিপোর্টারদের অক্লান্ত চেষ্টার ফলে উদ্ঘাটিত হলো লোমহর্ষক ঘটনা। ময়মনসিংহের গফরগাঁও, ত্রিশাল ও ভালুকা এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল গোচারণভূমি। ঐ এলাকায় চাষাবাদ হতো না এবং লম্বা লম্বা ঘাস জন্মাত সেখানে। শিশু অপহরণকারীরা শিশু চুরি করে ঐ স্থানে লুকিয়ে রাখত। তাদের নানা অসামাজিক কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাদের ওপর চালানো হতো যৌন নির্যাতন। কচি শিশুদের কাউকে কাউকে হাত পা ভেঙে বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষার কাজে লাগানো হতো। এই কাহিনি রূপকথাকেও যেন হার মানায়। ইত্তেফাকের এই কাহিনি প্রকাশিত হওয়ার পর পুলিশও সক্রিয় হয়ে ওঠে। পুলিশের এই অভিযানে ৬৪টি বালক উদ্ধার পায় এবং বিপুলসংখ্যক দুর্বৃত্ত গ্রেফতার হয়। এজন্য এবিএম মূসা বলেছেন, ‘বস্তুত সিরাজুদ্দীন হোসেনকে আমাদের দেশের ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিংয়ের জনক বলা যেতে পারে। ইত্তেফাকের ছেলেধরা-সম্পর্কিত রিপোর্টের জন্য তাকে ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত শেষ পর্যন্ত তা দেওয়া হয়নি।’
শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের লেখা ও অনুবাদ করা বহুসংখ্যক বইয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ছোট থেকে বড়’। এই বইয়ের জীবনীগুলো সেসব মানুষের, যারা ছোট অবস্থা থেকে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিলেন। তার নিজের জীবনও যেন এই গ্রন্থের নেপথ্যে মিশে ছিল। পাঁচ বছর বয়সে পিতৃহারা হয়ে প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে যে অবস্থানে টেনে তুলেছিলেন, তা ছোট থেকে বড় হওয়ারই এক সংগ্রামমুখর কাহিনি। ’৭১-এ ঘাতকদের হাতে তিনি যখন শহিদ হন, তখন তার বয়স মাত্র ৪৩ । স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশসেবার বৃহত্তর ক্ষেত্রে তার সংগ্রামী জীবনের বিকাশের যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল, ঘাতকের খড়্গ তার ওপর যবনিকা টেনে দেয়। দেশ বঞ্চিত হয় এক সত্যনিষ্ঠ ত্যাগী ও মেধাবী মানুষের সেবা থেকে।
লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জনতা