চার নদী খনন শুরু
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া
সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা চারটি নদীর নাব্য ফেরাতে প্রায় ২ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকার ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ কাজ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে বলে যানা গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য মতে চলতি জুন মাসের মধ্যেই তীর সংরক্ষণ কাজের দরপত্র আহ্বান করা হবে। আর ড্রেজিংয়ের জন্য জুলাইয়ের মাঝামাঝি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে।
‘বাঙ্গালী’, ‘করতোয়া’, ‘ফুলজোড়’ এবং ‘হুরাসাগর’ নামে এই অঞ্চলের চারটি নদীর ২১৭ কিলোমিটার অংশে নাব্য ফেরানোর মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভাঙন রোধ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রেখে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য এক বছর আগে পাউবোর পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রায় ৬ মাস যাচাই-বাছাই শেষে ‘বাঙ্গালী-করতোয়া-ফুলজোড়-হুরাসাগর নদী সিস্টেম ড্রেজিং/পুনঃখনন ও তীর সংরক্ষণ’ নামে ২ হাজার ৩৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকার ওই প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়।
পরে ওই প্রকল্পের জন্য চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ দেওয়া হয়। সর্বশেষ গেল মে মাসের শেষ সপ্তাহে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে স্টিয়ারিং কমিটি ড্রেজিং এবং তীর সংরক্ষণের জন্য আলাদাভাবে দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই কমিটির সদস্য পাউবো বগুড়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, ড্রেজিংয়ের কাজ দেশীয় ঠিকাদারদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে আন্তর্জাতিকভাবে দরপত্র আহ্বান করতে হবে। ড্রেজিংয়ের কাজ দুই বছরের শেষ করার টার্গেট নেওয়া হলেও তীর সংরক্ষণের কাজ শেষ করতে আরো দুই বছর সময় লাগবে। ফলে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে চার বছর লাগবে।
পাউবোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে কাটাখালি ও এলাই নদীর মিলনস্থল থেকেই ‘বাঙালি’ নদীর উত্পত্তি। এরপর সেটি উত্তর থেকে দক্ষিণে বগুড়ার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেরপুর উপজেলার খানপুরে করতোয়া নদীতে গিয়ে মিলেছে। সেখানে নদীটির নাম হয়েছে ‘করতোয়া’। এরপর ওই নদীটি সিরাজগঞ্জের নলকায় গিয়ে ‘ফুলজোড়’ নাম ধারণ করে শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ির দক্ষিণে হুরাসাগর নদীতে গিয়ে মিশেছে। তারপর সেই নদীর নাম হয়েছে ‘হুরাসাগর’—যেটি যমুনা নদীতে গিয়ে মিলেছে। উত্পত্তিস্থলে নদীটির গড় প্রশস্ততা ৯০ মিটার আর শেষ প্রান্তে সেই প্রশস্ততা বেড়ে হয়েছে ২০০ মিটার। প্রকল্পের আওতাভুক্ত ওই চার নদীর ২১৭ কিলোমিটার অংশের মধ্যে গাইবান্ধা সীমানায় ২৪ কিলোমিটার, বগুড়া সীমানায় ৯৯ কিলোমিটার এবং সিরাজগঞ্জে বাকি ৯৪ কিলোমিটার অংশ ড্রেজিং অথবা পুনঃখনন করা হবে। এর পাশাপাশি ভাঙন প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত বগুড়ার ৩২টি পয়েন্টে ১৯ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার এবং সিরাজগঞ্জের ২২টি পয়েন্টে আরো ১৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার অংশে তীর সংরক্ষণ (সিসি ব্লক ফেলে মুড়িয়ে দেওয়া) করা হবে।
পাউবোর কর্মকর্তারা জানান, বছরের পর বছর বালি আর পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ক্রমশ উঁচু হয়ে গেছে। আর কোনো বাঁধ না থাকায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টির পানিতেই নদীগুলো ভরে যায় এবং দুকূল উপচানো পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এবং শত শত একর ফসলি জমির আবাদ নষ্ট করে। ওই প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর বিভিন্ন অংশে ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত গভীর করা হবে। এর ফলে একদিকে বন্যার কবল থেকে যেমন ফসল রক্ষা পাবে তেমনি নদীগুলোতে পানি ধরে রাখার মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে ফসলের সেচসহ মাছের উত্পাদন বাড়ানোও সম্ভব হবে।
পাউবো বগুড়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, বড় ধরনের ওই প্রকল্পটির কাজ সরকার দ্রুত শুরু করতে চায়। এ কারণে প্রকল্পটি অনুমোদনের মাত্র ৭ মাসের মাথায় দরপত্র আহ্বানের মতো বড় একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি জুনের মধ্যেই তীর সংরক্ষণ কাজের দরপত্র আহ্বান হয়ে যাবে। ড্রেজিংয়ের দরপত্র যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে তাই সেটি করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। তবে ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে তা অবশ্যই হয়ে যাবে।’