তুমিই এই গ্রহের সেরা ফুটবলার

ফুটবল যদি একটি শিল্প হয়, তাহলে মেসি যে ফুটবলের শিল্পী, তা আর নতুন করে বলার নয়। পৃথিবীর বুকে রং-তুলি হাতে যত শিল্পী আছেন, সবাই মিলে হয়তো মেসিকে সঠিকভাবে তুলে আনতে পারবেন। হয়তো সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন মেসি। সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মতো দলটাকে কীভাবে একাই তরবারি চালালেন, সেই রক্তক্ষরণের কথা কোনো দিনও ভুলতে পারবে না ক্রোয়েটরা। যারা পর্দায় খেলা দেখেছেন, তাদের সামনে টিভি ক্যামেরাগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে তুলে ধরেছেন পাঁচ জনের মাঝখান থেকে পাওয়া বলটা কীভাবে ছোঁ মেরে জালের মুখে ঠেলে দিতে হয়। কিংবা এভাবেও যদি বলা হয় যে, ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে খেলার তৃতীয় গোলটা কীভাবে আদায় করিয়ে দিলেন আলভেজকে দিয়ে, সেটা কি ভাষায় লেখার মতো?

মেসি ফুটবল দুনিয়ায় জাদুকর, যিনি মাঠে দুই পা দিয়ে জাদু দেখাতে পারেন। তার পায়ের জাদুর সঙ্গে মেধার খেলাটা কতখানি, তা ফুটবল পণ্ডিতেরা দেখেছেন। খেলাটা যে পায়ের মধ্যে আটকে নেই। মাথা থেকে খেলাটা এনে পায়ের স্পর্শে ছড়িয়ে দিতে হয়, সেটা বোধহয় একমাত্র মেসিই প্রমাণ করতে পারছেন ফুটবলে। তার মনমুগ্ধকর ফুটবল সৌন্দর্যের কথা ভাষায় লেখা কঠিন।

কী অবিশ্বাস্য ফুটবলটাই না খেলেছেন মেসি। স্বপ্নের ফুটবলাটাই খেলেছেন তিনি। ক্রোয়েশিয়াকে নাকানি-চুবানি দিতে একাই যথেষ্ট ছিলেন। ৩৫ বছর বয়সে এসে আর কত করবেন! তার খেলা দেখে কি কখনো মনে হয়েছে এই মানুষটির ফুটবল ক্যারিয়ার গোধূলিলগ্নে। বয়সের তো একটা ব্যাপার আছে। খেলা দেখে দিব্যি মনে হচ্ছে, আর একটা বিশ্বকাপ অনায়াসে খেলে যেতে পারবেন তিনি। লুসাইল স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছিলেন ব্রাজিলিয়ান সাবেক তারকা রোনালদিনহো। মেরি খেলা দেখে মেসিকে হাততালি দিয়ে অভিনন্দন না জানিয়ে পারলেন না। যাদের সঙ্গে ফুটবলের চিরবৈরিতা, তাদের সেই ফুটবল ‘শত্রু’ মাঠে বসে আর্জেন্টিনাকে অভিনন্দন জানাবে, মেসিকে অভিনন্দন জানাবে, সেটা চাট্টিখানি কথা নয়। অনেক বড় পাওয়া। আর্জেন্টাইন আরেক সাবেক তারকা মাঠে ছিলেন। মারিও ক্যাম্পোস। মেসিদের গোল দেখে প্রশান্তির হাসি ছড়িয়েছেন। মেসির জাদুকরী পারফরম্যান্স দেখে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠেছেন। ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার জোসকোকে ইনসাইড, আউটসাইড ধোঁকা দিয়ে টেনেহিঁচড়ে বক্সের ভেতরে নিয়ে গিয়ে তারই দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বলটা আলতো করে আলভারেজের পায়ের ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছেন। গোলের পুরো গাঁথুনিটা দিয়েছেন মেসি। প্রাপক হয়ে আলভারেজ গোলটা শুধু নিজের নামে লিখে নিলেন। গোলের আগ পর্যন্ত ১২০ গজের ভেতরে মেসি যা করেছেন, তার বর্ণনা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সঠিকভাবে কলম হাতে কাগজের পাতায় তুলতে পারতেন, কথাটা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। পুরো ম্যাচেই তো জাদু দেখিয়েছেন এই খুদে জাদুকর। এই গ্রহের সেরা ফুটবলার যা করতে পারেন, সেটাই তো করেছেন।

মারাদোনাকে বলা হয় ফুটবলের ঈশ্বর। মারাদোনার দেশের মানুষ তাকে ফুটবলের ঈশ্বর বলেই মনে করে। লুসাইল স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও অনেকের হাতে ছিল মারাদোনার পোস্টার। মারাদোনা খেলেছেন, তার পাশে ছিল আরো অনেক ভালো মানের ফুটবলার। ভালোই নয়, উঁচুমানের ফুটবলার। নিজ নিজ পজিশনে তারাও ছিলেন মহাতারকা। অস্কার রুজেরিও, রিকার্ডো গুয়েস্তি, হেক্টর এনরিখ, বরুচাগা, হোর্হে ভালদানোরাই তো মারাদোনাকে ফুটবল ঈশ্বরের জায়গায় তুলে দিয়েছিলেন। একবার যদি ভাবা হয় মেসির পাশে বরুচাগা রুজেরিওদের মতো কয়েক জন ফুটবলার রয়েছেন, যারা মেসিকে খেলিয়ে নিয়ে যাবেন, মেসির ভেতর থেকে নির্যাসটুকু ছেঁকে নিয়ে আসবেন—এমন কজন ফুটবলার রয়েছেন এখনকার দলে। আলভারেজকে দিয়ে গোল করিয়েছেন মেসি। সেই আরভারেজ এক বছর আগে আর্জেন্টিনা দলে ঢুকেছেন। ফুটবল যুদ্ধে মারাদোনা যেভাবে সাপোর্ট পেয়েছেন, মেসি সেটা পাননি। পার্থক্যের জানালাটা আরেকটু খুলে দেওয়া যায়, বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসিকে বিবেচনা করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর্জেন্টিনার মেসিকে খেলতে হয় নিজের যা, তা দিয়ে। 

এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সব কটি খেলাই ছিল মেসিময়। গ্রুপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে গেলেও সেই ম্যাচে মেসি কি না করেছেন? হারের ম্যাচ থেকে ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘুরে গিয়ে আর্জেন্টিনাকে যেভাবে ফাইনালে তুলে আনলেন, তা ফুটবল দুনিয়া দেখেছে। আর নিশ্চই বলেছে, তুমিই এই গ্রহের সেরা ফুটবলার।