রায়পুরে বেড়েই চলেছে বিবাহবিচ্ছেদ!

দেড় বছরে ৫৮৭টি ঘটনা

 এম আর সুমন, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। গত দেড় বছরে তালাকের মাধ্যমে ৫৮৭টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ হয়েছে ২০১৮ সালে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভাসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, বাল্যবিয়ে, স্বামী দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা, পরকীয়া, স্বামীর প্রতি উদাসীনতা, নারীর প্রতিবাদী রূপ, নারীর শিক্ষা, স্বামীর মাদকাসক্তি, শ্বশুর-শাশুড়ির নির্যাতন, যৌতুকের জন্য ক্রমাগত চাপ, স্বামীর নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে বিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েছে।

জানা যায়, রায়পুর উপজেলায় ১০ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায়সহ কাজি অফিস রয়েছে ১৪টি। কাজি অফিসের নথি থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালসহ চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত উপজেলার উত্তর চরআবাবিল ইউনিয়নে ৫১টি, দক্ষিণ চর আবাবিল ইউনিয়নে ৪৩টি, উত্তর চরবংশী ইউনিয়নে ৩৭টি, দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নে ২৯টি, রায়পুর ইউনিয়নে ২৭টি, সোনাপুর ইউনিয়নে ২৫টি, কেরোয়া ইউনিয়নে ৯৫টি, বামনী ইউনিয়নে ৫৭টি, চরপাতা ইউনিয়নে ৩৩টি, চরমোহনা ইউনিয়নে ৪১টি ও পৌরসভার চারটি কার্যালয়ে ১৫৪টি বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) নিবন্ধন করা হয়েছে।

কনেপক্ষের তালাককে ডি-তালাক, ছেলেপক্ষের তালাককে বি-তালাক ও ছেলে-মেয়ের সমঝোতার তালাককে সি-তালাক বলা হয়। সেই হিসেবে পুরুষের চেয়ে নারীদের ক্ষেত্রে তালাক দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

একজন নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সামান্য কারণে একজন নারী কখনো বিবাহবিচ্ছেদ চান না। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন বাধ্য হয়েই এ কাজ করতে হয়। সে আরো বলেন, যেমন আমার বিয়ে হয় নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। বিয়ের পরপরই সংসারের দায়িত্ব চাপানো হয় আমার ওপর। সংসার চালাতে গিয়ে কিছু সমস্যা হলে স্বামীকে কিছু বললেও সে তার পরিবারের পক্ষ নিয়ে কথা বলত। বাধ্য হয়ে এক তরফা তালাক দেন।

উপজেলা নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের হুমায়ুন বলেন, বাল্যবিয়ে, স্বামী বিদেশে থাকা ও পরকীয়াঘটিত নানা জটিলতা নিয়ে প্রথমে দুই পরিবারে ফাটল ধরে পরে তা বিচ্ছেদে রূপ নিচ্ছে। তিনি জানান, রায়পুরে ৯০ শতাংশ তালাক স্ত্রীরা দিয়েছেন। এ উপজেলায় গত দেড় বছরে প্রায় ৬শ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। তবে এর ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষিত নারীরা নয়। কম শিক্ষিত ও গরিব মেয়েদেরও ডিভোর্স হচ্ছে।

স্ত্রীকর্তৃক তালাক পাওয়া এক পুরুষ বলেন, স্ত্রী পুরুষকে তালাক দিলে পুরুষ নির্যাতিত হলেও কোনোভাবে আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে না। পুরুষ নারীকে তালাক দিলে নারী কোর্টে গিয়ে মামলা করার সুযোগ পায়। কেরোয়া ইউনিয়নের এক নারী তার বিবাহবিচ্ছেদের পেছনের কারণ জানান এ প্রতিবেদককে। তার স্বামী বিয়ে করে ১৫ দিনের মাথায় বিদেশ চলে যায়। বিয়ের সময় শর্ত ছিল স্ত্রীকে পড়াশোনা করতে দেওয়া হবে। কিন্তু মিথ্যা বলে স্ত্রীকে পড়াশোনা বন্ধ করার জন্য চাপ দেন। তবু স্ত্রী পড়াশোনা চালিয়ে যান। এতে স্বামী তালাক দেবেন বলে হুমকি দেন। এক বছর স্বামী তার খোঁজ না নেওয়ায় স্ত্রীই স্বামীকে তালাক দেন।

কেরোয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহজাহান কামাল বলেন, ইউনিয়ন পরিষদে স্বামী-স্ত্রীর কোন্দল নিয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়। ইউনিয়ন কার্যালয়ে কয়েক দফা সালিশ বৈঠক করা হলেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতা না থাকার কারণে তাদের এক করা যায় না। ফলে তালাকের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলছে। এ ব্যাপারে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শিউলী আক্তার বলেন, আগে নারীর ক্ষমতায়ন এখনকার মতো ছিল না। পুরুষদের অত্যাচার সহ্য করে নীরবে সংসার করেছে। এখন মেয়েরা সচেতন, শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এখন মেয়েরা আর নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে চায় না। তাই হয়তো বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যাটা বেড়েছে।