দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বের জঘন্যতম গণহত্যার সাক্ষী বাংলাদেশ। এ গণহত্যারই ৫১ তম বর্ষপূর্তি আজ। তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় বিভাগ এ গণহত্যা সম্পর্কে অবগত থাকলেও, সেই সময়কার সচিবের নির্দেশে এ গণহত্যার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, হলোকাস্ট, আর্মেনিয়ান গণহত্যা এবং হলডোমোরকে স্বীকৃতি প্রদান করলেও বাঙালিদের গণহত্যার ব্যাপারে নীরবতা প্রদর্শন করেন।
তবে এ গণহত্যাকে স্বীকৃতি প্রদান করা কেবলমাত্র ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারেরই বিষয় নয়। সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং হোয়াইট হাউসের কেউ কেউ পাকিস্তানের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন। অর্থাৎ এ গণহত্যার জন্য তারাও পরোক্ষভাবে দায়ী।
এক দশক আগে যখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ তার নিজেদের লোকের ওপরেই গুলি চালিয়েছিল, তখন পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগই পিছু হটে যায়।
সেই সংঘাত চলাকালীন সময়ে জাতিসংঘ ধারণা করেছিল এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৩ লাখ এবং ৩ লাখেরও ১০ গুণ বেশি মানুষ এ ঘটনার ফলে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে ইয়েমেন সংঘাত সিরিয়া এবং আফগানিস্তান সংঘাত থেকেও মুখ্য হয়ে উঠে। সিরিয়া এবং আফগানিস্তান সংঘাত দুটিকে অবশ্য আমেরিকানরা ভুলে যেতেই বসেছে।
প্রগতিশীলেরা দাবি করে, ইয়েমেন সংঘাতে সৌদি আরব সংশ্লিষ্ট ছিল বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। তবে এ ঘটনায় ২০১৪ সালে শুরু হওয়া সংঘাতে ৪ লাখ মানুষের জীবননাশের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করা হয়।
অবশ্য বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকগুলো ছিল আরও বেশি নৃশংস। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় তুৎসি বিরোধী গণহত্যায় মাত্র তিন মাসে ৮ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে, বসনিয়া গৃহযুদ্ধে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মারা যায়, যাদের মধ্যে এক চতুর্থাংশই ছিলেন বেসামরিক নিরীহ নাগরিক। সেই সময় ধর্ষণের মাত্রা এতো পরিমাণে বেড়ে যায় যে সমগ্র ইউরোপ এ ঘটনায় ভীত হয়ে পড়ে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর কম্বোডিয়া সংঘাতও ভয়ানক ছিল। কম্বোডিয়ায় খেমার রুজ সরকারের পতনের পর গড়ে উঠে আমেরিকান ফ্রেন্ডস সার্ভিস কমিটি। তখন এ তথ্য প্রকাশ পায় যে এ সংঘাতে মাত্র চার বছরে ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
প্রতিটি সংঘাতই ভয়ংকর ছিল এবং প্রতিটি সংঘাতের উদ্দেশ্য ছিল হয় গণহত্যা চালানো নয়তো দেশের নাগরিকদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা।তবে এই এতগুলো সংঘাতের মধ্যে গণহত্যার মাত্রার দিক দিয়ে শুধুমাত্র রুয়ান্ডায় তুৎসি বিরোধী গণহত্যাটিই বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার কাছাকাছি। ১৯৭১ সালে আট মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর যে হত্যা, ইচ্ছাকৃতভাবে বাস্তুচ্যুতি এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য কার্যক্রম চালায়, তাতে প্রতি মাসে গড়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। অবশেষে বাংলাদেশে শহীদদের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৩০ লাখে।
অন্য অনেক গণহত্যার মতো, পাকিস্তানিদের এ গণহত্যার কারণ ছিল বর্ণবাদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের পর তার প্রতিষ্ঠাতা অনেক বছর অব্দি জীবিত ছিলেন এবং তিনি নতুন দেশটিকে আদর্শগতভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কিন্তু পাকিস্তানের নির্মাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানকে সুগঠিত করে গড়ে তোলার আগেই পাকিস্তান জন্মের মাত্র এক বছর পর মারা যান। তখন পাঞ্জাবিরা পাকিস্তানে আধিপত্য বিস্তার করে এবং রাজ্যকে একচেটিয়াভাবে দখল করার চেষ্টা চালায়। ভারতকে মধ্যে রেখে হাজার মাইলের দূরত্বে থাকা দুইটি দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সকল ক্ষেত্রেই বৈষম্য শুরু করে। এই ধরনের পদ্ধতিগত বর্ণবাদই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অনুঘটকের কাজ করে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করার পর পাকিস্তানিদের অহংকারকে চূর্ণ করার জন্য এবং বাঙালিদের ওপর হওয়া এতদিনের অত্যাচারের প্রতিবাদস্বরূপ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
তবে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তখন সেই ঘোষণাকে গুরুত্ব প্রদান না করে সেনাবাহিনীদের হুকুম প্রদান করে যেন তারা অন্তত ৩০ লাখ বাঙালিদের হত্যা করে এবং বাকিদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ভারতের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব পোষণ করতেন। একদিকে নিক্সন ভারতের জোট নিরপেক্ষতার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেন, অন্যদিকে কিসিঞ্জার চীনা নীতি অনুসরণ করে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে চীনে এক গোপন বৈঠকের সময়, কিসিঞ্জার এবং চীনা প্রধানমন্ত্রী, ঝো এনলাই, ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি তাদের পারস্পরিক অপছন্দের খাতিরে এক জোট হন। এর ফলে পাকিস্তানিদের সমস্ত অন্যায় দেখা সত্ত্বেও কিসিঞ্জার নীরব ছিলেন।
ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূত, জেনারেল আর্চার ব্লাড বাঙালিদের ওপর হওয়া গণহত্যা সম্পর্কে রিচার্ড ও নিক্সনকে জানান। ব্লাডের রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্যরা হতবাক হলেও কিসিঞ্জার তখনো নীরবতা প্রদর্শন করছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল। ফলে বাঙালিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান শুধু ছোটখাটো অস্ত্রই নয় বরং জেট ফাইটার বোমারও প্রয়োগ করে।
রিপোর্ট নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতার পর ব্লাড সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারির কাছে টেলিগ্রাম প্রেরণ করেন। সেখানে তিনি লিখেন, "আমাদের সরকার গণতন্ত্রকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে। নৃশংসতার নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের দেশ। আমাদের দেশ চলমান গণহত্যাকে আটকাতে ব্যর্থ হয়েছে।" যদিও ব্লাড সঠিকই বলেছিলেন কিন্তু নিক্সন এবং কিসিঞ্জারের বিরুদ্ধে যাওয়ায় তাকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয় কিসিঞ্জার। ফলে ব্লাডের কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তীতে ভারতের সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে এবং পাকিস্তান বাহিনি আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। বাংলাদেশে এখনো পাকিস্তানিদের নিয়ে তিক্ততা রয়েই গেছে।
অবশ্য বাংলাদেশের গণহত্যার জন্য দায়ী এ শক্তি এখন তালেবানকে সমর্থন জানায় এবং আফগানিস্তানে হাজারা ও অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যায় সহযোগিতা করে। এমনকি পাকিস্তানিদের হাত থেকে এখন পাকিস্তানিরাই রেহাই পাচ্ছে না।
বর্তমানে পাকিস্তানে অর্থনৈতিক মন্দা চলমান। এ পরিস্থিতিতেও ইসলামপন্থী ধ্যানধারণাকে পুঁজি করে সামরিক বাহিনি দেশের মধ্যপন্থী দল এবং সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার চালাচ্ছে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি এন্টনি ব্লিঙ্কেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান পাকিস্তানের কাছে সামরিক অস্ত্র বিক্রি নিয়ে আলোচনা করছেন, তবে পূর্বের মতো পাকিস্তানকে সহযোগিতা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও আর সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করা বোকার মতো কাজ হবে। আমাদের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। বাংলাদেশের গণহত্যাকে স্বীকৃতি প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো এ ব্যাপারে নীরব। এ গণহত্যাকে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে সহজেই পাকিস্তানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসা উচিত নয়। হলোকাস্ট এবং আর্মেনিয়ান গণহত্যাকে স্বীকৃতি প্রদানের মতোই বাংলাদেশের গণহত্যাকে স্বীকৃতি প্রদান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পাকিস্তানবিরোধী নয় বরং এ পদক্ষেপের মাধ্যমে পাকিস্তানকে আন্তজার্তিকভাবে দায়িত্বশীল সদস্য হতে বাধ্য করা যাবে।