টানবাজারের কেমিক্যাল গোডাউন

২০১০ সালের জুন মাসে পুরনো ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিকের কারখানায় আগুন ধরিয়া ১২৪ জন নিহত হন। এরপর পুরনো ঢাকার আবাসিক এলাকায় রাসায়নিকের কারখানা বা সংরক্ষণ নিষিদ্ধ করা হইয়াছিল; কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় গত ফেব্রুয়ারিতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন প্রাণ হারান। ফায়ার সার্ভিসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালের পর হইতে বাংলাদেশে ৮৮ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে ২৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রাণহানি ঘটিয়াছে ১৪০০ জনের, আহত হইয়াছে অন্তত ৫০০০ মানুষ।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের পর পুনরায় নড়িয়া চড়িয়া বসে সরকার। দেশের বিভিন্ন স্থানে জনবসতিপূর্ণ এলাকা হইতে কেমিক্যালের গোডাউন সরানোর জন্য অভিযান পরিচালনা করিতে থাকে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে সব ধরনের দাহ্য পদার্থ সরাইয়া ফেলিবার জন্য ১০ দিনের সময় বাঁধিয়া দেওয়া হয়; কিন্তু ১০ দিনের জায়গায় সাড়ে তিন মাস অতিবাহিত হইয়া গেলেও কেমিক্যালের গোডাউন সেখান হইতে সরাইয়া লওয়া হয় নাই। কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা বিস্মৃত হইয়াছেন অভিযানের সেই কথা। অনেকে ধার্য করিয়া দেওয়া ১০ দিনের নোটিশটিও পান নাই। সেই অভিযানের পর আর কোনো কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয় নাই। ফলে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগের মতোই অবাধে দাহ্য কেমিক্যাল ভর্তি ড্রাম দোকানে সাজাইয়া রাখিয়াছেন ব্যবসায়ীরা। তাহারা জানান, কোন কোন কেমিক্যাল তাহারা রাখিতে পারিবেন না—এইরকম কোনো নির্দেশনা তাঁহাদের দেওয়া হয় নাই। আমরা দেখিতে পাইতেছি, প্রশাসনের অভিযানের কোনো ধারাবাহিকতা নাই। তাহারা একবার অভিযান পরিচালনা করিয়াই ক্ষ্যান্ত দিয়াছেন, অভিযানের ফলোআপ করেন নাই। ফলে ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝিয়া ঝিম মারিয়া আছেন, গোডাউন সরাইবার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছেন না। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক তাহার অসহায়ত্বের কথা জানাইয়াছেন। বারবার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করিতে যাইয়াও তাহারা ব্যর্থ হইতেছেন। তিনি জানান, দোকানের সামনে কী কী কেমিক্যাল দোকানিরা রাখিতেছেন তাহার একটি তালিকা ঝুলাইয়া রাখিবার পরামর্শ তাহারা প্রদান করেন যাহাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিলে সহজে অগ্নি নির্বাপণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়; কিন্তু সেই পরামর্শ ব্যবসায়ীরা শুনিতেছেন না।

আমরা আশা করিব, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন অতিসত্বর পুনরায় টানবাজারে অভিযান পরিচালনা করিয়া তাহাদের অসমাপ্ত কার্য সমাপ্ত করিবে, সেখান হইতে বিপজ্জনক কেমিক্যাল গোডাউন অন্যত্র সরাইয়া নিতে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করিবে। একই সহিত আমরা আরও আশা করিব দেশের সর্বত্র যেখানেই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কেমিক্যালের গোডাউন আছে সেইগুলি দ্রুত অপসারণ করিতে সংশ্লি­ষ্ট প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে। কেননা জাতি আরেকটি মর্মান্তিক নিমতলী বা চুড়িহাট্টা দেখিতে চাহে না।