জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিতে টেকসই উন্নয়ন

গত শতাব্দীর শেষ ভাগে দুই পরাশক্তির মধ্য অস্ত্র প্রতিযোগিতা যে ভয়াবহ নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেছিল, জলবায়ু পরিবর্তন তার চেয়েও বহুমুখী ভয়াবহতার মুখে ঢেলে দিচ্ছে আজকের বিশ্বকে। ইতোমধ্যেই আমরা এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে শুরু করেছি। বাংলাদেশের মতো একটি নিম্ন ভূমিতে অবস্থিত দেশের জন্য এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠা এক মহাচ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা বাহুল্য, টেকসই উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন ২০৩০ সাল নাগাদ ধরা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশসমূহকে এক অসাধ্য সাধনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

প্রথমেই জেনে রাখা ভালো যে জলবায়ু পরিবর্তন মূলত মানব সৃষ্ট কিংবা জলবায়ুর নিজস্ব পরিবর্তন যা প্রকৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী সময় ধরে পরিবর্তন নিয়ে আশে। এই পরিবর্তনের পিছনে নানাবিধ কারণ থাকলেও মূলত শিল্প-বিপ্লবোত্তর আধুনিক শিল্পায়ন তথা যান্ত্রিক কলকারখানার বিস্তারের ফল কার্বন নিঃসরণ যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। আর এখান থেকেই তৈরি হয় অত্যধিক খরা, অতি বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, টাইফুন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ভয়ংকর সব প্রাকৃতিক বিপর্যয়। টেকসই উন্নয়নের ধারণা হলো এমন উন্নয়ন যা বর্তমানের চাহিদা মেটাতে এমন সব কর্মপন্থার আশ্রয় নেয় যা পরবর্তী প্রজন্মের চাহিদাকে ধ্বংস করে না বরং সমৃদ্ধ করে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মারাত্মক রাজনীতি চলে। উন্নত বিশ্ব ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে এ বিতর্ক বহুদিন ধরে। এর পরেও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে ২০১৬-৩০ সালের মধ্যে তা অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তার তের নম্বর লক্ষ্যটিতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কথা বলা হলেও অন্য লক্ষ্যগুলোও পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করার পথে পরিবেশগত বিপর্যয় প্রধান অন্তরায়। বিশ্বের প্রতিটি সম্প্রদায়ই এ কথা স্বীকার করে নিয়েছে যে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যে কি না এই পরিবর্তনের জন্য নিতান্তই অপরাধী। বৃহত্ অর্থে বলতে গেলে টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ, আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে জীবন মান বৃদ্ধি করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সচেষ্ট; কিন্তু নিগূঢ়ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর প্রতিটি স্তরই বাজেভাবে প্রভাবিত হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রথম ও প্রধান শিকার হচ্ছে নিম্নভূমির দেশগুলো যারা অর্থনৈতিকভাবেও বেশ পিছিয়ে। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন মোটা দাগে তিনটি বিষয়ে বিবেচ্য। তা হলো রাষ্ট্রের অবস্থান, অর্থনীতি ও জনসংখ্যা। এই মানদণ্ডের বিচারে বাংলাদেশ প্রতিটি স্তরই ভঙ্গুর। আইপিসিসি ও অন্যান্য সংস্থার মতে বাংলাদেশের অদ্ভুত ভৌগোলিক অবস্থানই এর দুর্যোগের মূল কারণ। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতিও সীমাবদ্ধ ও তার বেশিরভাগই ঢাকা কেন্দ্রিক। জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল স্থান। সাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল তলিয়ে যাবার প্রবল আশঙ্কা অসংখ্য রয়েছে। ইতোমধ্যেই উপকূল ও খরা প্রবণ অঞ্চল থেকে কর্মজীবী মানুষ ঢাকার মতো শহরগুলোতে ভিড় জমাতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঢাকা পৃথিবীর দ্বিতীয় অবাসযোগ্য শহর। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকিতে থাকা পরিবেশগত অভিবাসীদের ঢল আগামী দিনগুলোতে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে যা টেকসই উন্নয়নকে পর্যুদস্ত করে তুলবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় তার জিডিপির ২ শতাংশ হারায়। শুধু ২০০৭ সালের সিডরের কারণে বাংলাদেশ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয় প্রাণহানির হিসেব বাদেই। বাত্সরিক হিসেবে অবকাঠামোগত ক্ষতিও কম নয়। টেকসই উন্নয়নের কথা বলতে গেলে দেখা যাবে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লিঙ্গ বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি, দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও শিক্ষাক্ষেত্রেও পশ্চাদগমন হয়। এ সব মিলিয়েই জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের পথে এক কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা বাংলাদেশ এককভাবে সমাধা করতে অক্ষম।

জলবায়ু পরিবর্তনের পিছনে উন্নয়নশীল বিশ্ব কমই দায়ী বরং উন্নত বিশ্বের অমানবিক অর্থনৈতিক লিপ্সা থেকেই আজকের এ অবস্থা। ২০০৯ সালের কোপেনহেগেন সম্মেলন থেকেই উন্নত বিশ্বকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। তারা ২০২০ সালের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলোর পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলায় ১০০ বিলিয়ন ডলার দেবার কথা থাকলেও তা পূরণে তারা কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত প্যারিস জলবায়ু চুক্তি যে আশার সঞ্চার করেছিল তা এখন অনেকটা মলিন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশের এই চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার নিঃসন্দেহে উন্নয়নশীল বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কমিয়ে দিবে। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে দেখলে দেখা যাবে যে, উন্নত বিশ্ব পৃথিবীর মোট উত্পাদনের ৭০-৭৫ শতাংশের মালিক। উন্নত বিশ্বে বসবাসরত মাত্র ১৯% শতাংশ জনগণ পৃথিবীর ৮০ শতাংশ পর্যন্ত দূষণের জন্য দায়ী; কিন্তু এ তুলনায় উন্নত বিশ্ব পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কমই অবদান রাখছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি প্রাক শিল্প-বিপ্লবোত্তর জলবায়ু তাপমাত্রা লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। উন্নত বিশ্বের সদিচ্ছার অভাবই এর জন্য প্রধানত দায়ী বলেই স্বীকার করে নেওয়া হয়।

নবায়নযোগ্য শক্তিকে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি বিকল্প হিসেবে ধরা হলেও এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। উন্নয়নশীল বিশ্বের আর্থিক অসমর্থতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব ভীষণভাবে পরিলক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের অসহযোগী মনোভাবও প্রকাশ্য। পরিবেশগত ঝুঁকি থাকলেও বাংলাদেশ, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো তার অর্থনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখার জন্য উদগ্রীব। টেকসই উন্নয়ন এতে কিছুটা বিপর্যস্ত হলেও উন্নয়নশীল বিশ্ব অটল। পৃথিবীকে যদি সত্যিই রক্ষা করতে হয় তাহলে উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত সবাইকেই একযোগে কাজ করতে হবে কেননা পরিবেশ কোথাও সীমাবদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব থেকে কেউই রক্ষা পাবে না এই বিভেদ এড়িয়ে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়