জরাগ্রস্ত সমাজে অনুকরণীয় একজন 

আবুল মোমেন। তার পরিচয় নানাভাবেই দেওয়া যায়। তিনি একাধারে কর্মযোগী, শিক্ষানুরাগী, কবি, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং একুশে ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন সত্যিকারের আলোর দিশারি। জীবন ও মানবিক মূল্যবোধের মিশেলে একজন অসাধারণ মানুষ তিনি। দেশের যে কোনো সংকটময় মুহূর্তে এবং শুভ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার আন্দোলনে আমরা তাকে পাই একজন আলোকবর্তিকা হিসেবে। বরাবরই নিভৃত জীবনাচরণে অভ্যস্ত আবুল মোমেন গত প্রায় ৪৫ বছরের অধিককাল থেকে শিশুশিক্ষা ও সমাজভাবনা নিয়ে কাজ করে আসছেন। কিন্তু তার অসামান্য যোগ্যতা, সমাজভাবনা ও কর্মের প্রতি যথাযথ সম্মান আমরা এখনো জানাতে পারিনি—যদিও তাতে তার সৃষ্টিশীল কর্ম এবং ঔজ্জ্বল্যের কোনো ঘাটতি হয়নি। তিনি এগিয়ে চলেছেন তার আপন মহিমায়। জন্মের ৭৪ বছর পার করে আজ তার ৭৫তম জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, স্যার। 

আমাদের চলমান জীবন সব সময় আনন্দের নয়, আবার আমাদের অনুভূতিগুলোও সর্বদা একই রকম থাকে না। কিন্তু সমাজে এমন অনেক আলোকিত ‘ব্যক্তি’ আছেন— যাদের দেশ ও সমাজ নিয়ে ইতিবাচক লেখা এবং কর্মগুলো আমাদের মন খারাপ ও হতাশাজনক সময়ে মানসিক শক্তি এবং সাহস জোগায়। তারা আলোকিত ও সপ্রাণ সমাজের স্বপ্ন দেখেন এবং অন্যকেও আশাবাদী মানুষে রূপান্তর করতে জানেন, নাগরিকের সুন্দর ও অর্থবহ ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য এবং মানুষের কল্যাণচিন্তায় নিজেকে নিবেদন করেন। নিজের লালিত আদর্শকে কখনই বিসর্জন হতে দেননি, বরং প্রতিনিয়ত তাকে আরো শানিত করেছেন। আবুল মোমেন তেমনই একজন। শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক আবুল ফজল এবং লেখিকা উমরতুল ফজলের সন্তান আবুল মোমেনের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে। ব্যক্তিজীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক আবুল মোমেনের দাম্পত্য সঙ্গী শীলা মোমেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী। আবুল মোমেনের লেখাপড়া চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধ্যাপনা দিয়ে তার পেশাজীবনের শুরু। সাংবাদিকতাও করছেন। বর্তমান অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিকের হাতেখড়ি আবুল মোমেনের হাতে। কিন্তু তিনি নিজেকে শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বচ্ছন্দবোধ করেন। তার সঙ্গে যে কোনো আড্ডা-আলোচনা বিপরীতজনকে নতুন করে ভাবতে শেখায়; নিজের জানার সীমাবদ্ধতা ও ভাবনার সংকটকে চিনতে এবং জানতে সাহায্য করে। সমাজে নানা মানুষের ভিড়ে অনুকরণীয় আদর্শিক একজন হওয়ার জন্য তার প্রতি আমাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। 

বর্তমান জরাগ্রস্ত সমাজে আমাদের তরুণ প্রজন্ম নানা কারণে দিকভ্রান্ত। একই সঙ্গে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন লোকের সংখ্যাও অতিনগণ্য। সেই অল্পসংখ্যক মানুষের একজন আবুল মোমেন। এ ধরনের একজন মানুষকে অনেকেই গম্ভীর, রাসভারী ও নিরস ব্যক্তি বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুবাদে দেখেছি অসামান্য জীবনবোধ ও দারুণ রসবোধের অধিকারী তিনি। তিনি যখন কথা বলেন, তখন জ্ঞানের সঙ্গে মায়াও জড়িয়ে রাখেন। তাই যে কোনো আলোচনা-আড্ডায় তার কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও রেশ রয়ে যায় মানুষের মনে। জ্ঞানের ক্ষেত্রেও কলা-সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞান, রাজনীতিসহ শিক্ষার নানা শাখা-উপশাখায় অবাধ বিচরণ তার। আর সেসব জ্ঞান সহজবোধ্যভাবে সাধারণ মানুষের কাছে তার লেখনীর মাধ্যমে পৌঁছে দিচ্ছেন নিরলসভাবে। 

শুধু তা-ই নয়, লেখালেখি আর সাংবাদিকতা ছাপিয়ে প্রায় তিন দশকের বেশি আবুল মোমেন-শীলা মোমেন দম্পতি নিজেদের জড়িয়ে রেখেছেন শিশুদের শিক্ষাকে আরো প্রাণবন্ত করার প্রয়াসে। তারা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন আনন্দময় শিশু বিদ্যায়তন ‘ফুলকি’। মোমেন স্যার শুধু এতেই ক্ষান্ত হননি। শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য তিনি স্কুলপর্যায়ে ২০০১ সাল থেকে চালু করেছেন ‘সমন্বিত শিক্ষা-সংস্কৃতি কার্যক্রম’। তার একটাই চাওয়া—আমাদের বর্তমান পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা হয়ে উঠুক জ্ঞানকেন্দ্রিক ও আনন্দময়। মোমেন দম্পতি যত্ন নিয়ে, ভালোবেসে, মমতা দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মজবুত শিক্ষার ভিত তৈরি করে চলেছেন নীরবে-নিভৃতে। আমরা তাদের এ কর্মপ্রয়াসকে স্যালুট জানাই। 

আবুল মোমেন ছোট-বড় সব পাঠকের জন্যই সৃজনশীল ও মননশীল নানা রকমের লেখা লিখে চলেছেন নিরন্তর। তার উল্লেখযোগ্য কিছু বই ‘জিয়নকাঠি : প্রাণবন্ত শিক্ষার সন্ধানে,’ ‘শিশুর জয়যাত্রা’, ‘রবীন্দ্রনাথ : বিকল্পহীন অবলম্বন’, ‘বাংলা ও বাঙালির কথা’, ‘ছোটদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’, ‘কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’, ‘যাপনে উদযাপনে’, ‘আরো এক বধ্যভূমি’ প্রভৃতি।  আমাদের বর্তমান জরাগ্রস্ত সমাজে একজন মানুষের পক্ষে নানা প্রলোভনে জীবনভর ন্যায়নিষ্ঠ থেকে নিজের আদর্শের সঙ্গে আপসহীন পথচলা সত্যিই কষ্টসাধ্য। কিন্তু আবুল মোমেন ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায় নিজেকে কখনো কোনো কিছুতে বিলীন হতে দেননি। আদর্শ আর নীতির প্রশ্নে তিনি নিজেকে করেছেন অনন্য। যে কোনো সফল ও কীর্তিমান মানুষ সম্পর্কে একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়—‘তার কীর্তির চেয়ে তিনি মহত্’। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আবুল মোমেন তেমনই একজন। স্যারের চরিত্রের একটি বড় গুণ তার পরমতসহিষ্ণুতা। তবে তিনি দ্বিচারিতা সহ্য করতে পারেন না মোটেই। 

স্যারের ৭৫তম জন্মদিনে আমাদের চাওয়া, আপনি দীর্ঘায়ু হোন। আনন্দের ফল্গুধারায় আরো উচ্ছল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠুন আপনি। গৌরবদীপ্ত জীবনের পঁচাত্তর বসন্তপূর্তিতে আপনাকে আমাদের শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসা ও অভিবাদন। আপনার জন্মদিন বাঙালির শুভদিনে পরিণত হোক। একই সঙ্গে দেশ-সমাজ ও শিক্ষা নিয়ে আপনার আশাবাদী স্বপ্ন এবং কর্মগুলো সফল হোক। আমাদের জন্য আমৃত্যু সচল থাকুক আপনার ক্ষুরধার ও সাহসী কলম। 

লেখক : বিতার্কিক ও কলাম লেখক