ক্যানসারমুক্ত দেশ গড়তে সুলভে টিকার প্রশ্নে

জরায়ুমুখে ক্যানসার বা ‘Cervical Cancer’ নারীদের একটি ভয়াবহ ব্যাধি। পৃথিবীর অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে নারীদের এই রোগের বিস্তার অনেক বেশি। জরায়ুতে ভাইরাস প্রবেশের পর ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে ক্যানসার ধরা পড়তে। সহজে লক্ষণ বোঝা যায় না বলে এই ক্যানসারকে নীরব ঘাতক বলা হয়। গবেষণা বলছে, দুই যুগের বেশি সময় পার হলেও প্যাড সিমরান টেস্ট ছাড়া জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্ত করা যায় না। ফলে আক্রান্ত নারী বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে বিবিসির সর্বশেষ তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৫০ লাখ ৭০ হাজারের বেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং ৩০ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি নারীর মৃত্যু হয়। প্রতি বছর ১২ হাজার জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত নারী শনাক্ত করা হয়। 

নারীর শরীরে একটি অঙ্গ হচ্ছে জরয়ু। যখন ক্যানসার শুরু হয় সার্ভিক্সে বা জরায়ুমুখে, তখন ইহাকে বলে সার্ভিক্যাল বা জরায়ুমুখ ক্যানসার। বিশ্বব্যাপী নারীর শরীরে প্রচলিত যত ক্যানসার রোগ ধরা পড়ে, তার মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসার চতুর্থ  সর্বাধিক ক্যানসার। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্স অন ক্যানসার অনুসারে, ৫০০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি বাংলাদেশি নারী জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রতি বছর ১৭ হাজার ৬৮৬ জন আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রায় ১০ হাজার ৩৬২ জনের মৃত্যু হয়। রোগটির দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ না থাকায় যখন রোগটি ধরা পড়ে, তখন আক্রান্ত নারীর বাঁচার সম্ভাবনা তেমন থাকে না। 

হিউম্যান প্যাপিলোমা (এইচপিভি) ভাইরাস নামে একধরনের ভাইরাস জরায়ুরমুখে ক্যানসার হওয়ার প্রধান কারণ। মাসিক বা যৌনমিলনের সময় এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। সংক্রমণের প্রায় এক যুগের অধিক সময় জরায়ুমুখের স্বাভাবিক কোষ পরিবর্তিত হতে থাকে এবং একসময় তা ক্যানসারে রূপ নেয়। ২০ বছরের নিচে মেয়েদের সাধারণত এই ক্যানসার ধরা পড়ে না। অল্প বয়সের মেয়েরা জরায়ু সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় লোকলজ্জায় জরায়ুর ক্যানসারের কথা স্বামী, মা-বাবাসহ, কারো কাছে প্রকাশ করেন না। জরায়ুমুখ আক্রান্ত নারীদের ৩৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সে এ ধরনের ক্যানসার ধরা পড়ে। ৬০ বছর পরও এই ভাইরাসে নারী আক্রান্ত হতে পারেন, তবে এই সংখ্যা খুবই কম। 

হিউম্যান প্যাপিলোমা (এইচপিভি) ভাইরাস অধিকাংশ নারীর জীবনে কোনো না কোনো সময়ে আক্রান্ত বা সংক্রমিত হয়। জরায়ুমুখ ক্যানসারের ১০০ ধরনের ভাইরাস থাকলেও এইচপিভি ১৬ ও ১৮ সংক্রমণ হয় বেশি। আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় নারী চিকিৎসকের সংখ্যা কম। পুরুষ চিকিৎসকের কাছে আক্রান্ত নারীরা কোনোমতেই যেতে চান না। অধিকাংশ চিকিৎসক শহরমুখী। গ্রামঞ্চলের সিংহভাগ হতদরিদ্র নারী যে কোনো ধরনের সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। জরায়ুর ক্যানসারে আক্রান্ত নারীর সংসার ভেঙে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় গরিব পরিবারের নারীরা সব সহ্য করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশের শেষ রক্ষা হয় না। ক্যানসার নির্ণয়ে স্কিনিং করতে হয়। প্যাপটেস্ট করে রোগটি ধরা গেলে আক্রান্ত নারীকে পুরোপুরি সুস্থ করা যেতে পারে।  

বাল্যবিবাহ, পতিতাবৃত্তি বা অতিরিক্ত যৌনাচার জরায়ুর ক্যানসারের অন্যতম কারণ। ঘন ঘন সন্তান জন্মদান, গর্ভ খালাস, এভরশন ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারিতে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত যন্ত্রপাতি ক্যানসারের উল্লেখযোগ্য কারণ। অশিক্ষিত, গরিব ও বস্তি এলাকার মেয়েরা তামাক-জর্দা, সাদা খাওয়ার অভ্যাস, দীর্ঘদিন খাওয়ার বড়ি সেবন, অপুষ্টি, ইনফেকশনসহ অন্যান্য কারণে জরায়ুর ক্যানসার হয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় পার হলে ক্যানসারটি জরায়ুমুখ বা সার্ভিক্স থেকে জরায়ু ডিম্বাশয়, ফেলোফিয়ান, ইউটেরাস, ব্লাডারসহ তলপেটের অন্য জায়গায় এমনকি পেটের ওপরের অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্যানসার যদি জরায়ুর ভেতরে যায়, সে ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ক্যানসারের স্থান বা আশপাশ অংশ অপারেশন করতে হয় এবং বেশি ছড়িয়ে পড়লে জরায়ু বা ইউটেরাছ কেটে বাদ দিতে হয়। অপারেশনের সময় পার হয়ে গেলে কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি দিতে হয়। তবে নারীর শেষ রক্ষা আর হয় না। নারীর ব্লাড ক্যানসার, ব্রেস্ট ক্যানসার, ব্রেইন ক্যানসার, মুখ বা কণ্ঠনালির ক্যানসারের চেয়ে জরায়ুমুখের ক্যানসার ভয়াবহ। চিকিৎসার জন্য সব সহায়-সম্বল বিক্রি করে চিকিৎসা করাচ্ছেন দেশের ৭০ শতাংশ নারী। আক্রান্তদের অধিকাংশ অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করেন। 

দেশের গ্রামঞ্চালের অসহায়, গরিব নারীদের চিকিৎসায় জড়িত Family welfare visitor (FWV) কয়েক জনের সঙ্গে আলাপ করলে তারা তাদের কর্মজীবনের বিস্ময়কর কিছু অভিজ্ঞতার কথা জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক জন FWV জানালেন, পুরুষ শাসিত এই সমাজব্যবস্থায় বিবাহিত নারীর জরায়ুমুখ ক্যানসারের কথা স্বামী বা ঘরের কেউ জানামাত্রই ৮০ শতাংশ নারীকে ঘরছাড়া হতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে নারী ক্যানসারে আক্রান্ত হলেও সন্তানের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে কোনো কথা প্রকাশ করতে চায় না। অধিকাংশ স্বামী তার স্ত্রীর অসুখ-বিসুখের কোনো খোঁজ-খবরও রাখে না। এটাই গ্রামীণ জীবনের নারীদের বাস্তবতা। যে কারণে দরিদ্র পরিবারের নারী ক্যানসার রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে। নারী হোক বা পুরুষ, ক্যানসার শব্দটি সবার কাছে এক ভয়ংকর আতঙ্ক। এই রোগের কথা সহজে কেউ উচ্চারণ করতে চায় না। 

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলি ইউনিয়নের FWV আম্বিয়া আক্তার এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, প্রতি মাসে ক্লিনিক ও স্যাটেলাইট ক্লিনিকে কমিবেশি ৬০০-৭০০ নারীর সঙ্গে কথা হয়। জরায়ুমুখ ক্যানসার থেকে রক্ষার জন্য সচেতনতামূলক পরার্মশ ছাড়া আমাদের চিকিৎসা করার সুযোগ নেই। প্রতি FWCতে একজন করে ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে নেই। গরিব পরিবারের মেয়েরাই জরায়ুর ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে চিকিৎসার ব্যয়ভার অনেকেই বহণ করতে পারছেন না। গরিব আরো গরিব হচ্ছে। সিলেট ওসমানী হাসপাতালের মডেল ক্লিনিকের FWV ছন্দা পোদ্দার বলেন, কোনো নারীকে যখন কপারটি পদ্ধতি লাগাতে হয়, তখন মেয়েদের আমরা জরায়ূ চেক করতে পারি। অধিকাংশ নারীর জরায়ুতে ঘা, ক্ষতসহ নানা জটিলতায় পদ্ধতি দেওয়া যায় না। এসব নারীই বেশি জরায়ুর ক্যানসারে আক্রান্ত হন। গরিব মেয়েদের কান্না দেখে অনেক সময় সইতে পারি না। তাই দেশের নারী সমাজের স্বার্থে বিনা মূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবি।  

পরিতাপের বিষয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও এ দেশে অযত্ন-অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে যুগের পর যুগ ধরে হাজার হাজার নারী আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। একজন মায়ের মৃত্যু তার পরিবারে সারা জীবনের কান্না। এ দেশে হাজার হাজার নারী অকালে মৃত্যুর পরও আশার আলো যে, একটি ওষুধ কোম্পানি প্রথম বারের মতো জরায়ুমুখের ক্যানসারের ভ্যাকসিন প্যাপিলোভা ভ্যাক্স বাজারজাত করেছে। এটা বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনে নবযুগের সূচনা করেছে। গত ২ আগস্ট ঢাকায় এক সেমিনারে এই ভ্যাকসিনের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। প্রফেসর ড. ফেরদৌসী বেগমের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. টি এ চৌধুরী, জাতীয় অধ্যাপক সাহলা খাতুন, অধ্যাপক গুলশান আরা বেগমসহ দেশের খাতনামা চিকিত্সগণ। সেমিনারে বলা হয়, জরায়ুমুখ ক্যানসারের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মাধ্যমে দেশে এক নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। ৯ থেকে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত সুস্থ নারীকে শূন্য দশমিক ৫ মিলি পরিমাণ তিন ডোজ টিকা দিতে হয়। প্রথম ডোজের এক মাস পর দ্বিতীয় ডোজ এবং প্রথম ডোজের ছয় মাস পর তৃতীয় ডোজ টিকা দিতে হয়। 

ভারত জরায়ুর ক্যানসারের মধ্যে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। সে দেশে প্রতি বছর ৬৭ হাজার মা জরায়ুর ক্যানসারে মারা যায়। তাদের দেশের ৫ কোটি নারীকে ভ্যাকসিনের আওতায় এনে ৩০ বছরের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যানসারমুক্ত করার ঘোষণা করেছে সরকার। ভারতে প্রতি ডোজ টিকার মূল্য ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় নির্ধারণ করা হলেও বাংলাদেশে টিকার মূল্য আড়াই হাজার করে তিন ডোজ টিকায় সাড়ে সাত হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্যানসারের রোগীদের চিকিত্সাসহায়তা করে যাচ্ছে। মহামারি করোনা থেকে রক্ষার জন্য বিনা মূল্যে করোনার ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্যাকসিন হিরো পুরস্কারে এবং বিশ্বের তৃতীয় মানবিক প্রধানমন্ত্রীর খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাই জরায়ু ক্যানসারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে বিনা মূল্যে টিকা দিতে হবে। এটাই প্রত্যাশা। 

লেখক : পরিবার পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ