খুলনা জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে সাত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদগুলো শূন্য রয়েছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে অসুস্থ শিশুদের কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা মিলছে না। যার কারণে দরিদ্র অভিভাবকরা তাদের অসুস্থ সন্তানদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় পল্লি চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছে। তাদের পরামর্শমতো পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়া ওষুধ সেবনের কারণে অসুস্থ শিশুদের শারীরিক সমস্যা আরো জটিল হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শীতের ঠান্ডা আবহাওয়ায় শিশুরা নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, আমাশয়, সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকার কারণে চিকিৎসা না দিয়েই অভিভাবকরা শিশুদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরে এসব অভিভাবকরা তাদের অসুস্থ সন্তানদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় পল্লি চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হচ্ছে। তাদের পরামর্শমতো পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়াই ওষুধ সেবনের কারণে অসুস্থ শিশুদের শারীরিক সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। ভুল চিকিৎসার কারণে অনেক শিশু পড়ছে মৃত্যুর ঝুঁকিতে।
খুলনা মহানগরীর পার্শ্ববর্তী বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও রূপসা, দিঘলিয়া, তেরখাদা, ফুলতলা, দাকোপ, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে শিশু বিশেষজ্ঞ (কনসালটেন্ট) চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এসব উপজেলায় মেডিক্যাল অফিসাররা চিকিৎসা দিচ্ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা।
খুলনা জেলা শহর থেকে কয়রা উপজেলা সদরের দূরত্ব ১১০ কিলোমিটার। নদী পথে কয়রা থেকে খুলনায় আসতে সময় লাগে ৯-১০ ঘণ্টা। আর ভাঙাচুরা রাস্তা দিয়ে স্থলপথেও সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। এ উপজেলার পাশাপাশি সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ও খাজরা ইউনিয়নের মানুষও কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০১৩ সালে ৫০ শয্যায় রূপান্তরিত হলেও শুরু থেকে শিশু বিশেষজ্ঞ পদটি ফাঁকা রয়েছে। ফলে এ উপলোর শিশুরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কয়রা উপজেলার পশ্চিম দেয়াড়া গ্রামের জাহানারা বেগম বলেন, ‘আমার নাতি জন্মের পর থেকে অসুস্থ। কয়রা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে একদিন রেখে খুলনায় রেফার্ড করে। এরপর খুলনা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হলে অনেক টাকা খরচ হয়। এখনও আমার নাতি সুস্থ হয়নি। যদি কয়রায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকত তাহলে অতদূরে যাওয়া লাগত না। আমরা এখানেই চিকিৎসা পেতাম।
খুলনা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও নেই শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। সেখানেও মেডিক্যাল অফিসাররা আগত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করেন। সমস্যা জটিল হলে খুলনা মেডিক্যালে কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
তেরখাদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার জানান, হাসপাতাল ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর থেকে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই।
দাকোপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুদীব বালা বলেন, শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। গত বুধবারে দাকোপে শিশু রোগী ভর্তি ছিল সাত জন। এর মধ্যে তিন জন শ্বাসকষ্ট ও চার জন ডায়রিয়ার। বহির্বিভাগে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান তিনি।
রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে শিশুদের নিউমোনিয়ায় বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া ডায়রিয়ার রোগীও পাওয়া যাচ্ছে।
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলে জেলা শহরে অসুস্থ শিশুদের শিশুদের স্থানান্তর (রেফার্ড) কমে যাবে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে শূন্য পদের তালিকা পূরণের জন্য চিঠি পাঠানো রয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।