ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। উপজেলা সদর থেকে বাড়ি ছয়-সাত কিলোমিটার। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখন যোগাযোগব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। থানা সদর থেকে ছয়-সাত কিলোমিটার যেতে হতো পায়ে হেঁটে। সময় লাগত দের-দুই ঘণ্টা। থানা সদরে কোনো প্রয়োজন হলে যেমন—শার্ট বা প্যান্ট বানানো, খেলার বল লিক হয়ে গেলে তা ঠিক করা ইত্যাদি কাজে আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে যেতাম। সেদিন সিএনজি অটোরিকশায় মাত্র ১০-১৫ মিনিটেই বাড়ি পৌঁছে গেলাম।
মা মারা যাওয়ার পর গ্রামের বাড়ি খুব একটা যাওয়া হয় না, গেলেও যাওয়া হয় না খুব একটা সময় নিয়ে। এইচএসসি এবং কলেজের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার জন্য ক্লাস বন্ধ থাকায় এবার হাতে একটু সময় নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলাম। অনেক দিন পর পুরো গ্রাম ঘুরে দেখলাম। আগে যে বাড়িটার চারদিকে ফাঁকা ছিল, ছিল সব বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন, সেই বাড়িটার চারদিকে বাড়ি হওয়ায় খুঁজেই পাচ্ছিলাম না। আগে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে বিরাট চড়া পার হতে হতো। ছোটবেলায় ভরদুপুরে বা সন্ধ্যায় একা একা চড়া পাড়ি দিয়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে গা ছমছম করত, ভয় হতো। এখন এক গ্রাম আরেক গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। যেমন এক বাড়ি আরেক বাড়ির সঙ্গে লেগে গেছে। পাড়া বা গ্রামগুলোকে দৃশ্যত আর আলাদা করার সুযোগ নেই।
নদীর ধারে নিভৃত গ্রাম। বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর নদী রক্ষা বাঁধ হয়েছে। নদীর ধারে পাকা বাঁধে বসে সমুদ্রসৈকতের স্বাদ নেওয়া যায়। কেউ বড়শিতে ধরছে মাছ। বাঁধের ধারে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দোকানপাট। সেখানে লোকজন চা খাচ্ছে, খাচ্ছে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, ডিশের লাইনে টিভিতে দেখছে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। এ যেন এক অনাবিল আনন্দ।
ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর কেউ একজন দিয়ে গেছেন নদীর মাছ, কেউ-বা দিয়ে গেছেন তরতাজা লাউ, ধনেপাতা, পেঁয়াজপাতা, গরম টাটকা মুড়ি। গিন্নি তো মহাখুশি। নিভৃত গ্রামের সরল মানুষগুলো কাউকে কিছু দিতে পারায় মহাখুশি তারাও। গ্রামের এসব মানুষ সবাই হয় স্বশিক্ষিত, না হয় অল্প শিক্ষিত। তাদের দুঃখ, শিক্ষিত ও অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী কেউ গ্রামে থাকেন না।
গ্রামের যেসব বাড়িতে মানুষ ভর্তি থাকত, সব সময় আত্মীয়স্বজন নিয়ে আনন্দ-কোলাহলে মুখরিত থাকত, সেই সব বাড়িতে এখন কেউ থাকে না। গ্রামের সুন্দর বাড়ি, দৃষ্টিনন্দন বাংলাঘর সবই অযত্নে ভেঙে পড়ার উপক্রম। বন-জঙ্গলে ভরা বাড়ি যেন শিয়ালের আখড়া।
যে গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, পাকা রাস্তা ছিল না, ফোন ছিল না, পত্রিকা ছিল না, ছিল না টিভি, সেই গ্রাম এখন বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে, আছে পাকা রাস্তা, যাতায়াতের জন্য আছে সিএনজি অটোরিকশা, আছে দৈনিক বাজার, মোবাইল ফোন, ডিশের লাইন, টাকা পাঠানো এবং পাওয়ার জন্য আছে বিকাশ, গ্যাসের সিলিন্ডার, কোনো কোনো গ্রামে আছে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র, যেখানে একজন এমবিবিএস ডাক্তার থাকার কথা, প্রায় গ্রামেই আছে কমিউনিটি ক্লিনিক। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পায় গ্রামবাসী। এখন সকাল ৯-১০টার মধ্যে গ্রামেও পত্রিকা পৌঁছে যায়। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, বাইপোস্টে পত্রিকা রাখতাম। তখন পত্রিকা মানেই ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে যখন পত্রিকা পেতাম, তখন পত্রিকা বের হওয়ার চার-পাঁচ দিন পার হয়ে গেছে। প্রতিদিন ঐ পত্রিকা পড়ার জন্যই পোস্ট অফিসে অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম—কখন ডাকপিয়ন আসেন। ইত্তেফাকে কচি-কাঁচার আসরে দাদাভাই (রোকনুজ্জামান খান)-এর চিঠি পড়ে খুব মজা পেতাম। খবরের বাইরে উপসম্পাদকীয় ‘স্থান-কাল-পাত্র লুবন্ধক’—গাছ পাথর, পড়ে অনেক বিষয়ে চোখ খুলেছে। শিক্ষকতা পেশায় যোগদানেরও অনেক পরে জানতে পারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ছদ্মনাম ছিল গাছ পাথর।
গ্রামবাসীর অনেকে এত কিছুর পরও সুন্দর বাড়ি, নির্মল বায়ু, স্নিগ্ধ কোলাহলযুক্ত গ্রাম ছেড়ে উপজেলা বা জেলার ছোট্ট ভাড়া বাসায় থাকেন অনেক কষ্টে। জানলাম, গ্রাম ছাড়ছে জীবিকার তাগিদে বা সন্তানের লেখা-পড়া করাতে। প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, প্রায় গ্রামেই আছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোনো কোনো গ্রামে আছে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ। তাহলে কি এসব প্রতিষ্ঠানে যথাযথ লেখাপড়া হচ্ছে না? সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যে বই ও উপবৃত্তি দেওয়া হয়। শিক্ষকগণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যোগ্য। এর পরও গ্রামের সুন্দর বাড়ি ছেড়ে কেন কষ্টে শহরের ভাড়াবাড়িতে থেকে বেশির ভাগ সন্তান কেজি স্কুলে পড়ছে? কেজি স্কুলের বেতন ৫০০ টাকা থেকে হাজার টাকার ওপরে। কেজি স্কুলের শিক্ষকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, অধিকাংশ শিক্ষক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন।
ছাত্র-শিক্ষকের যে অনুপাত থাকার কথা, আমাদের দেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার ধারেকাছেও নেই। ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষকের পক্ষে ছাত্রছাত্রীদের যথাযথ সুপারভেশন সম্ভব হয় না। কেজি স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত সরকারি স্কুলের চেয়ে কিছুটা ভালো। সরকারি বিদ্যালয়ের চেয়ে কেজি স্কুলে জবাবদিহির ব্যবস্থা আছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রেখে কেজি স্কুলে ভর্তি হতে অভিভাবকদের মানসিক অবস্থাও প্রভাবিত করে। অভিভাবকেরা মনে করেন, সন্তান কেজি স্কুলে পড়লে ‘অভিজাত, আধুনিক, উচ্চ শ্রেণিভুক্ত হলাম’।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত উন্নয়ন করা যায়। যেসব গ্রামে উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ আছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী প্রধান অথবা অফিসপ্রধানের জন্য কোয়ার্টার নির্মাণ করা উচিত। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ আরও একজন সার্বক্ষণিক অবস্থান করবেন, তখন শুধু ঐ প্রতিষ্ঠানেই নয়, এলাকায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তৈরি হবে শিক্ষার আবহ। ফিরে আসবে শিক্ষার পরিবেশ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিতে বিদ্যোত্সাহী ব্যক্তিদের থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো কমিটির সভাপতি যেন দুই টার্মের বেশি না থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা উচিত। বিদ্যোত্সাহী ব্যক্তিদের নিয়োগের জন্য উপজেলায় ইউএনও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার; জেলায় জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ও জেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে সার্চ কমিটি করে বিদ্যোত্সাহী ব্যক্তির একটি প্যানেল করা যেতে পারে। এসব প্যানেল থেকে বিদ্যোত্সাহী ব্যক্তিদের কমিটিতে আনার ব্যবস্থা রাখতে হবে। দেশে অনেক শিক্ষিত বেকার। প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ সব উচ্চবিদ্যালয়, মাদ্রাসায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। এর ফলে শিক্ষার গুণমান উন্নয়ন সম্ভব।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ শহরের অধিকাংশ স্কুলের নেই খেলার মাঠ। পাখির খাঁচার মতো বন্ধ পরিবেশ। ফলে শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ বিকাশ হয় ব্যাহত। অথচ গ্রামে আছে অবারিত মাঠ ছাত্রছাত্রীরা এখানে হেসেখেলে খেলতে পারে।
যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে গ্রামের সুন্দর বাড়ি রেখে শহরে যাওয়ার স্রোত কিছুটা হলেও বন্ধ করা যেতে পারে। এতে শহরে ছাত্রছাত্রী ভর্তির চাপ কিছুটা হলেও কমবে। গ্রামে ফিরে আসবে শিক্ষার পরিবেশ।
লেখক :সহকারী অধ্যাপক