ইত্তেফাক জনগণের সঙ্গে থাকে

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) ইত্তেফাক ও জনগণ পারস্পরিকতার ইতিহাস। ইত্তেফাক মানে ঐক্য। জনগণ বা বাঙালির ঐক্য ধরে রাখায় ইত্তেফাক তার জন্মলগ্ন থেকেই সচেষ্ট। কীসের জন্য ঐক্য? বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে এই ঐক্য; ঐক্য বাঙালির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য। কারণ লাগাতার ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশ। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণে ইত্তেফাক নামের পত্রিকাটির অবদান ইতিহাস।

যেকোনো পত্রিকার ভূমিকা নির্ভর করে সম্পাদকের মন-মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর হাত ধরে ইত্তেফাকের যাত্রা শুরু হলেও, সম্পাদক হিসেবে খ্যাতকীর্তি হয়ে আছেন তফাজ্জল হোসেন, যিনি মানিক মিয়া/মানিক ভাই নামে পরিচিত ছিলেন। বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়া বাঙালি-মুক্তির বাতিঘর। বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশক ভাষণ/সংগ্রাম আর ইত্তেফাকের লেখনী; বিশেষ করে মানিক মিয়ার কলাম ‘চলে মোসাফির’-এর ভূমিকা ছিল অনুঘটকসম। বঙ্গবন্ধু লড়েছেন তার মুখনিঃসৃত ভাষণ ও সংগ্রাম দিয়ে; আর মানিক মিয়া লড়েছেন তার ইত্তেফাকের পাতায়, কলমনিঃসৃত লেখনী দিয়ে। বঙ্গবন্ধু-মানিক মিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা ও স্নেহের।

অবশ্য মানিক মিয়া কোনো দিন আওয়ামী লীগ করেননি; কিন্তু তিনি সব সময়ই ছিলেন বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টা। তিনি কেমন উপদেষ্টা ছিলেন আর বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়ার উপদেশ কেমন মানতেন, তার কিছু দৃষ্টান্ত আছে (এমন দৃষ্টান্ত এন্তার); আমি তিনটি ঘটনার কথা বলছি।

বঙ্গবন্ধু লড়েছেন তার মুখনিঃসৃত ভাষণ ও সংগ্রাম দিয়ে; আর মানিক মিয়া লড়েছেন তার ইত্তেফাকের পাতায়, কলমনিঃসৃত লেখনী দিয়ে। বঙ্গবন্ধু-মানিক মিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল শ্রদ্ধা ও স্নেহের।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৬১ সালে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির লক্ষ্যে আগে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ১৯৪৭ থেকেই সক্রিয়/সংগ্রামী ছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না স্বাধীনতার প্রশ্নে বামপন্থিদের (নিষিদ্ধঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির) কী দৃষ্টিভঙ্গি। বামপন্থিদের সঙ্গে মানিক মিয়ার ভালো যোগাযোগ ছিল; তিনিই কমরেড মণি সিংহ এবং কমরেড খোকা রায়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর গোপন বৈঠকের আয়োজন করে দিলেন। এই প্রথম স্বাধীনতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির সংলাপ হলো। একাধিক আলোচনায় ঐকমত্য হলো; তবে দুই কমরেডই বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করলেন, স্বাধীনতা প্রসঙ্গটি প্রকাশ্যে না তুলতে, কারণ তাতে প্রচণ্ড বাঙালিবিদ্বেষী এবং ক্ষমতাসীন আইয়ুব খানের রোষানলে পড়তে হবে। তবে সিদ্ধান্ত হলো, যৌথভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। বলা বাহুল্য, স্বাধীনতার সপক্ষের রাজনীতিকে বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে মানিক মিয়া অবদান রাখলেন।

২.
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৬২ সালের বড়দিনে (২৫ ডিসেম্বর)। ভারতীয় উপদূতাবাসের (ঢাকায়) রাজনৈতিক কর্মকর্তা শশাঙ্ক ব্যানার্জীকে বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে দেওয়ার জন্য একটি চিঠি হস্তান্তর করেছিলেন। 

চিঠিতে বাঙালির স্বাধীনতার জন্য ভারতের সাহায্য প্রত্যাশা করেছিলেন। চিঠি প্রদানের স্থানটি ছিল ইত্তেফাক সম্পাদকের কার্যালয়। আর শশাঙ্ক ব্যানার্জীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন মানিক মিয়াই। এই চিঠির উত্তর পেতে দেরি হওয়ায় বঙ্গবন্ধু গোপনে আগরতলা একাকী যান। আগরতলা মিশনের ব্যাপারটি মানিক মিয়া জানতেন; তবে আওয়ামী লীগ জানত না।

Untitled-1

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরবিরোধী দলসমূহের আইয়ুববিরোধী সভা হওয়ার কথা ছিল। আওয়ামী লীগ আমন্ত্রিত। ছয় দফার মুসাবিদা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বঙ্গবন্ধু ঠিক করলেন যে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শাহ আজিজ যাবে। এই সিদ্ধান্ত জেনে মানিক মিয়া বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘শাহ আজিজের ওপর আস্থা রাখা যায় না। ক’দিন আগেই সে ডানপন্থী মুসলিম লীগ করত। তুমিই লাহোর যাও, যা বলার তা সম্পর্কে কিছু নোট নিয়ে যাও।’ বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়ার পরামর্শ শুনে নিজেই লাহোর গিয়েছিলেন; আমরা পেয়েছিলাম বাঙালির মুক্তিসনদ ছয় দফা, যা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে ইত্তেফাকের ভূমিকা ছিল জোরালো।

লেখক: চেয়ার প্রফেসর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চেয়ার।