বর্তমান একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে নির্বাচিতদের কারও কারও সঙ্গে দলটির গোপন চুক্তির বিষয়টি আবারও আলোচনায়। চুক্তি অনুযায়ী ‘অঙ্গীকার’ বাস্তবায়ন না করায় সংরক্ষিত আসনে দলের মহিলা এমপি অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীকে (সায়মা) কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠিয়েছিলেন জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নোটিশের জবাব না দেওয়ায় ‘জাপার সাংবিধানিক অবজ্ঞার শামিল ও সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে পরিগণিত’ করে শনিবার দলের প্রেসিডিয়াম ও প্রাথমিক সদস্য পদসহ তার দলীয় সকল পদ-পদবি স্থগিত করে দিয়েছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক ও এফবিসিসিআই’র সাবেক পরিচালক অধ্যাপিকা মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী এমপিকে কারণ দর্শানো নোটিশটি রাঙ্গা পাঠিয়েছিলেন গত ২০ মে। এর কপি ইত্তেফাকের কাছেও রয়েছে। যদিও শনিবার পদ-পদবি স্থগিতের চিঠিতে এরশাদ উল্লেখ করেছেন, ‘দলের মহাসচিব কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন ২৬ মে।’ তারিখ যাই হোক, রাঙ্গা স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে মাসুদা রশীদকে বলা হয়েছিল, ‘একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন নির্বাচনে- জাতীয় পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের ফোরামে কিছু শর্ত সাপেক্ষে আপনাকে মনোনয়ন প্রদান করা হয়। যার কপি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। আপনার স্বাক্ষরিত পার্টি সংক্রান্ত অঙ্গীকারপত্রও আছে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়- আপনার দেওয়া অঙ্গীকারগুলো আপনি যথাযথভাবে পালন করেননি। অন্যদিকে প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও আপনার মাসিক চাঁদা দুই বত্সর যাবত পরিশোধ করেননি।’ ১০ দিনের মধ্যে নোটিশের লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছিল এই নারী এমপিকে।
মাসুদা রশীদ চৌধুরীর দলীয় পদ স্থগিতের বিষয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গা গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘উনি (মাসুদা রশীদ) কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব দেননি। এটা দলের চেয়ারম্যান ও দলের প্রতি অবজ্ঞা। এজন্য পার্টি চেয়ারম্যান তার পদ স্থগিত করেছেন। দুই বছর ধরে দলের চাঁদাও দেননি তিনি। এছাড়াও আনুসঙ্গিক কিছু টাকা দল তার কাছে পাওনা। দল চালাতে টাকা লাগে। টাকা তাকে দিতেই হবে। অন্যথায় দল তার বিরুদ্ধে পরবর্তী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে।’ তবে মাসুদা রশীদ ও তার ছেলে ব্যারিস্টার সানজিদ রশীদ চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে দাবি করেছেন, দলীয় কোনো চাঁদা বকেয়া নেই। তবে মনোনয়ন নেওয়ার সময় টাকার বিষয়ে কিছু মৌখিক কথাবার্তা ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বকেয়া আসলে কিসের? দলের মাসিক চাঁদা নাকি মনোনয়ন বিক্রির?
মাসুদা রশীদ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি কোনো কারণ দর্শানো নোটিশ পাইনি। দলীয় পদ স্থগিতেরও কোনো চিঠি পাইনি। সবই জেনেছি মিডিয়ার মাধ্যমে। রাঙ্গা সাহেবই সবকিছু করছেন। তাছাড়া আমি স্যার (এরশাদ), রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের সাহেবের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এরশাদ সাহেব অসুস্থ; তিনি কখনও বাসায়, কখনও হাসপাতালে; এই অবস্থায় শনিবার এই ধরনের চিঠিতে উনি কখন কীভাবে স্বাক্ষর করলেন! এটাও যাচাই করা দরকার।’
‘মনোনয়ন নেওয়ার সময় আপনার সঙ্গে কী দলের কোনো লিখিত অঙ্গীকার ছিল, থাকলে সেটি কি?’- গতকাল আলাপকালে এরকম প্রশ্ন করা হলে মাসুদা রশীদ চৌধুরী বলেন- বিষয়টি আমার ছেলে বিস্তারিত বলতে পারবে। পরে তার ছেলে ব্যারিস্টার সানজিদ রশীদ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘মনোনয়ন পাওয়ার জন্য আমার মা যেদিন দলের মনোনয়ন বোর্ডে সাক্ষাতকার দিয়ে মনোনীত হন, সেদিন রাতে রাঙ্গা সাহেব আমাদেরকে তার বাসায় ডেকে নেন। মাকে নিয়ে আমি তার বাসায় যাই। তখন রাঙ্গা সাহেব বলেছিলেন- দল চালাতে টাকা লাগে, কিছু টাকা দেন, সেটা দলের নামে ব্যাংকে ডিপোজিট করে রাখা হবে। তখন দলের জন্য পাঁচ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। অনেকক্ষণ কথাবার্তা শেষে আমরা কিছু টাকা অগ্রীম দিয়েছিলাম, বাকি টাকার চেক দিই। পরে বিষয়টি নিয়ে এরশাদ সাহেব, রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরের সঙ্গে আমরা কথা বলি। তারা আমাদের বলেছেন কোনো টাকা দিতে হবে না। এরপরেও এখন এসব কেন হচ্ছে?’
ব্যারিস্টার সানজিদ বলেন, ‘মূল কথা টাকা চাচ্ছে, টাকা দিচ্ছি না। এজন্যই এতকিছু। তা নাহলে সংরক্ষিত আসনে দলের আরও তিনজন এমপি রয়েছেন। কই, তাদের নিয়েও তো এতকিছু হচ্ছে না।’ জানা গেছে, মাসুদা রশীদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে আজ সোমবার এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
গঠনতন্ত্র লংঘন করে মনোনয়ন বোর্ড গঠন
একাদশ সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য জাপার যেই আটজনের সমন্বয়ে কমিটি বা বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, সেটি দলের গঠনতন্ত্র লংঘন করে করা হয় বলে জাপার একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য অভিযোগ তুলেছেন। গঠিত মনোনয়ন বোর্ডের প্রধান ছিলেন দলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের। অন্য সাতজন সদস্য ছিলেন- দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, গোলাম কিবরিয়া টিপু, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি ও অ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলাম।