অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স এবং বাংলাদেশের ফার্মেসি সেবা

বাংলাদেশে ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে ফার্মেসিতে ‘গুড ফার্মেসি প্র্যাকটিস’ প্রায় একেবারেই অনুপস্থিত। যদি অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা রোধ করতে হয়, তাহলে ফার্মেসিতে ‘গুড ফার্মেসি প্র্যাকটিস’ প্রচলন এখন সময়ের দাবি। সুতরাং, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যোগ্য রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টদের যদি সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল এবং ব্যক্তিমালিকানায় খুচরা ফার্মেসিতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এবং সঠিক ওষুধ, সঠিক দামে, সঠিক মাত্রায় একজন রোগীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ফার্মাসিস্টের সঠিক পরামর্শে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা ক্রমান্বয়ে কমে আসবে

দুই দিন যাবত্ পুষ্পার সর্দি-কাশি, সঙ্গে জ্বর-জ্বর ভাব। আজ দুপুরে তার পরীক্ষা। কিন্তু এই শরীর নিয়ে পড়াও হচ্ছে না, আবার শরীরের অবস্থার আরো অবনতি ঘটারও একটি আশঙ্কা আছে। কী করা যায়? পুষ্পার মা দ্রুত ফোন করেন পুষ্পার ডাক্তার মামাকে। অল্প সময়ে জ্বরের বর্ণনা দেওয়ার পরই শুনতে পাওয়া যায় তিনি বলেছেন, ‘ভাইজান, প্যারাসিটামলে কি এ জ্বর সারবে? একটা অ্যান্টিবায়োটিক দিন প্লিজ।’ ও পাশ থেকে ডাক্তার কিছু বোঝাতে চেষ্টা করলেন। অতঃপর বোনের কাছে পরাস্ত হয়ে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে হয়তো লিখতে বললেন যে কোনো একটি অ্যান্টিবায়োটিকের নাম!

কী অ্যান্টিবায়োটিক দিলেন ডাক্তার? দুই মিনিটের ফোনালাপে ডাক্তার কেমন করে জানলেন জ্বরটা কি ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হলো, নাকি ভাইরাসের? প্রায় সব ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণে জ্বর হয়। আমরা সবাই জানি, জ্বর নিজে কোনো রোগ নয় বরং যে কোনো রোগ বা অস্বাভাবিকতার উপসর্গ বা নির্দেশক। তিন থেকে সাত দিন অতিবাহিত না হলে জ্বরের কারণ বের করা মুশকিল; অন্য দিকে ডায়াগনস্টিক টেস্টের জন্যও পাঁচ-সাত দিন অপেক্ষা করা শ্রেয়। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে, ব্যাকটেরিয়ায় কোষপ্রাচীর থাকে, যা ব্যাকটেরিয়াকে বাঁচিয়ে রাখে এবং মানবদেহকে সংক্রমণ করার ক্ষমতা বজায় রাখে। কিন্তু ভাইরাসের এই কোষপ্রাচীর থাকে না।

অনেক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার এই কোষপ্রাচীরকে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে ব্যাকটেরিয়া আর বেঁচে থাকতে পারে না। যেহেতু ভাইরাসের কোষপ্রাচীরই নেই, সেখানে ভাইরাস সংক্রমণে বা ভাইরাস জ্বর বা ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশিতে ভাইরাস নিতান্তই অকার্যকর। ভাইরাসজনিত জ্বর বা সর্দি-কাশি তিন থেকে সাত দিনে এমনিতেই ভালো হয়ে যায় মানবদেহের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকার কারণে। এই ভাইরাসজনিত জ্বর বা সাধারণ সর্দি-কাশিতে যারা অ্যান্টিবায়টিক দিয়ে চিকিত্সা করে রোগী ভালো করে থাকেন, ব্যাপারটা অনেকটা ‘ঝড়ে বক মরে, কবিরাজের কেরামতি বাড়ে’-এর মতো। সুতরাং, জ্বর বা সাধারণ সর্দি-কাশি হলেই যোগ্য রেজিস্টার্ড ডাক্তার দ্বারা পরীক্ষানিরীক্ষা না করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা অযৌক্তিক। এটি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সে জোরালো ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশে।

অধিকাংশ সময় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই, রোগী নিজের পূর্ব-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে, বা লোকমুখে শুনে অথবা ওষুধ বিক্রেতার প্ররোচনায় কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে যে কোনো অসুখেই কারণ বিচার না করে যে কোনো ওষুধ, যে কোনো ডোজে গ্রহণ করছে। ওষুধের এই যথেচ্ছ ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। ১৯২৮ সালে পেনিসিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিকটি আবিষ্কারের পর স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং বলেছিলেন, ‘এই অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে কোটি প্রাণ বেঁচে যাবে। কিন্তু এর জাদুকরি কার্যকারিতার দরুন এর অপব্যবহারও নিশ্চিত বেড়ে যাবে।’ উদ্ভাবকের ভবিষ্যদ্বাণী যেন সত্যি হতে চলেছে। কারণ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স শুধু বাংলাদেশে নয় বরং বর্তমানে এটি এখন একটি অন্যতম বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

ওষুধের অপব্যবহার

কখন ওষুধের অপব্যবহার হয়? আমরা নিত্যদিন ওষুধের অপব্যবহার করে থাকি, যেমন, পূর্বে বর্ণিত পুষ্পার শারীরিক অবস্থায় হয়তো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন নেই, কিন্তু দ্রুত সুস্থতার জন্য সে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করছে বা প্রয়োজনের অধিক ওষুধ গ্রহণ করছে। দামি ওষুধ বেশি কার্যকর ভেবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ওষুধ গ্রহণ করা, ভুল ওষুধ গ্রহণ করা বা সঠিক ওষুধ ভুল ডোজে বা ভুল পথে বা ভুল সময়ে, ভুলভাবে গ্রহণ করা—এ সবগুলোই ওষুধের অপব্যবহার এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের অন্যতম কারণ।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হলে কী হয়

২০১৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদন অনুসারে ২০৫০ সালের মধ্যে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হবে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। অনিয়মিতভাবে, অসম্পন্ন ডোজে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে তৈরি হবে রেজিস্ট্যান্স। সাধারণ ঠান্ডা-কাশিতে ওষুধ কাজ করবে না, ফলে দ্রুত সাধারণ ঠান্ডা-কাশি রূপ নেবে জীবননাশক মরণব্যাধিতে।

সাধারণ রোগের উপশম হতেই দীর্ঘ সময় লাগবে, হাসপাতালে বেডের অপর্যাপ্ততা বাড়বে এবং বাড়বে চিকিত্সার ব্যয়। মানুষের জন্য তৈরি অ্যান্টিবায়োটিক গবাদি পশু, পাখি এবং মাছের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ফলে গবাদি প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের কাছেই ফিরে আসছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া। ফলাফল পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের চরম বিপর্যয়! প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স এখনই সংযমিত না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির অবনতি ঘটবে প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত।

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রেসক্রিপশন লেখার উপযুক্ত ডাক্তার যদিও-বা পাওয়া যায়, বাস্তবতা হলো, গ্রামাঞ্চলে একজন যোগ্য রেজিস্টার্ড ডাক্তার পাওয়া সত্যি দুরূহ। সৌভাগ্যক্রমে ডাক্তার যদি পাওয়াও যায়, সেই ডাক্তারের ভীষণ ব্যস্ততার কারণে তিনি রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক-সংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্য দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

অন্যদিকে ফার্মেসি কাউন্সিল অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ১৩টি সরকারি ও ২৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ফার্মেসি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ফার্মেসি কাউন্সিল পাশকৃত শিক্ষার্থীদের ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করে থাকে। একইভাবে ১০টি সরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি ও ২৮টি বেসরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি ডিপ্লোমা-ইন-ফার্মেসি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং এসব হেলথ ইনস্টিটিউট হতে ডিপ্লোমা-ইন-ফার্মেসি কোর্স সম্পন্ন করার পর ফার্মেসি কাউন্সিল শিক্ষার্থীদের ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি জেলা ভিত্তিক ফার্মেসি সার্টিফিকেট রেজিস্ট্রেশন কোর্স পরিচালনা করে থাকে। উক্ত কোর্সে ভর্তিকৃত প্রশিক্ষণার্থী সপ্তাহে এক দিন করে তিন মাসব্যাপী ফার্মেসি টেকনিশিয়ান সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করার পর ফার্মেসি টেকনিশিয়ান সার্টিফিকেট রেজিস্ট্রেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ফার্মেসি কাউন্সিল তাদের ‘সি’ ক্যাটাগরিতে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করে থাকে এবং ‘সি’ ক্যাটাগরিতে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত ব্যক্তি ওষুধের দোকানে (ফার্মেসিতে) কাজ করার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৫০০ নতুন ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট এবং আনুমানিক সমানসংখ্যক ‘বি’ এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট কাজের জন্য বের হচ্ছেন। প্রতি বছর ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পক্ষেত্রে প্রায় ৯৮০টি নতুন চাকরির সুযোগ থাকে। ফলে প্রতি বছর আনুমানিক ৫২০ জন ‘এ’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরির সুযোগ পায় না বলে ধরে নেওয়া যায়।

বাংলাদেশে ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে ফার্মেসিতে ‘গুড ফার্মেসি প্র্যাকটিস’ প্রায় একেবারেই অনুপস্থিত। যদি অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা রোধ করতে হয়, তাহলে ফার্মেসিতে ‘গুড ফার্মেসি প্র্যাকটিস’ প্রচলন এখন সময়ের দাবি। সুতরাং, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যোগ্য রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টদের যদি সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল এবং ব্যক্তিমালিকানায় খুচরা ফার্মেসিতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় এবং সঠিক ওষুধ, সঠিক দামে, সঠিক মাত্রায় একজন রোগীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ফার্মাসিস্টের সঠিক পরামর্শে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। একজন ফার্মাসিস্টের শিক্ষা, দক্ষতা এবং সেবা বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স সংযমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, উন্নত করবে স্বাস্থ্যসেবার মান এবং সুগম করবে আরোগ্যের পথ। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা অনেকটা এগিয়েছে। আগামী ২০৩০ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গণ্য হতে চলেছে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ও যৌক্তিক ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্য অর্জনে দরকার সব খুচরা ফার্মেসিতে যোগ্য রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্টের পদায়ন নিশ্চিতকরণ।

লেখকদ্বয়:

ডা. মো. ইফতেখার হাসান খান, মুখ্য কারিগরি উপদেষ্টা, বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ প্রকল্প, ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস ফর হেলথ

রাইয়ান আমজাদ, ফার্মাসিস্ট, কারিগরি উপদেষ্টা, বেটার হেলথ ইন বাংলাদেশ প্রকল্প, ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস ফর হেলথ