গৌরবের আখ্যান

প্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাককে ৭০তম জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। ইত্তেফাক আমার তরুণ বয়সের সজীব পত্রিকা। ষাটের দশকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার বাবা বাড়িতে ইত্তেফাক পত্রিকা রাখেন। প্রতিদিন ইত্তেফাক পড়ে সংবাদ মাধ্যমে যোগাযোগের ধারণা পাই। আমরা তখন বাবার চাকরিসূত্রে রাজশাহীতে থাকতাম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করার পরে ঢাকায় আসি। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির চাকরিতে যোগদান করি। শিক্ষার্থী থাকাকালে ইত্তেফাক পড়েছি। ঢাকায় এসেও বাড়িতে ইত্তেফাক পত্রিকা রাখি। পড়ার আনন্দে মুগ্ধ হই। একই সঙ্গে দৈনিক সংবাদ পত্রিকা পড়তাম। ‘সংবাদ’ পত্রিকার খবরের পাতা এবং সাহিত্যের পাতা আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় ছিল।

ইত্তেফাক পত্রিকার নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থেকে সামগ্রিক অভিমত ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কারণে স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকরা কখনো ভালো চোখে দেখেনি। ফলে তাদের শাসনের জাঁতাকলে বারবার ইত্তেফাক পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ হয়েছে এবং সর্বশেষ আঘাত ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করাসহ সমুদয় প্রেসটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার দেড়-দুই মাস পর সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ১৫ আগস্ট প্রথম সংখ্যা  প্রকাশিত হয়।

১৯৫৩ সালে ২৪ ডিসেম্বর ‘ইত্তেফাক’ দৈনিক পত্রিকা ঘোষণা করে ২৫ ডিসেম্বর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সম্পাদক মানিক মিয়া ছদ্মনামে ‘মোসাফির’ ও ‘রাজনীতির মঞ্চ’ নামে কলাম লিখে পাকিস্তানের ভিত কাঁপিয়ে স্বাধিকার আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলার মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। পত্রিকাটি শুরু থেকেই সাধু ভাষার রীতিনীতি অনুসরণ করে প্রকাশিত হলে, পরবর্তী সময়ে চলতি ভাষায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু আজ অবধি সম্পাদকীয় কলাম সাধু ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে।

এ দেশের সংবাদপত্র শিল্পের ইনস্টিটিউট হলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, রাজনৈতিক মঞ্চ’, ‘রঙ্গমঞ্চ’ এসব কলামই ছিল এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণার উত্স। সত্সাহসী নিরপেক্ষ ও মানুষের অধিকার নিয়েই ছিল তার লেখনী। পাকিস্তানি শাসকের বর্বরতা আর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই তিনি এ দেশের মানুষের মুক্তির কথা, বৈষম্যের কথা আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা অবিরত লিখে গেছেন।

দেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে ইত্তেফাক তার অর্জিত ভাবমূর্তি নিয়ে আগের পাঠকের কাছে ফিরে আসে। এই ফিরে আসা ছিল গৌরবের আখ্যান। এই ধারা অব্যাহতভাবে বর্তমানেও চলছে।