ইত্তেফাকের সঙ্গে আছি অনেক দিন 

এত দীর্ঘ সময় আমার দেখা হয়নি, তবুও ইত্তেফাকের সঙ্গে আছি অনেক দিন হলো। এতটুকু সময়ে অনেক দৃশ্যপটের সঙ্গী হয়েছি। জেনেছি নানান তথ্য। প্রথমেই বলতে হয়, কেমন আছি আমরা? আমাদের চিন্তাভাবনায় কোন দিক বেশি প্রকাশিত হয়?  পরিবার-সমাজের সঙ্গে কতটা মানানসই আমরা? এক কথায় বলতে গেলে, আশানুরূপ ভালো নেই বর্তমান প্রজন্ম। 

কিন্তু কেন? আমরা কেন আমার সহপাঠীর ক্ষতি করছি, কেন আমরা বিশ্বাস হারাচ্ছি একে অপরের থেকে। ছোটবেলায় জেনেছি—আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই শিশুরাই নাকি একদিন সবকিছু পরিচালনা, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করবে। হ্যাঁ, আমরাই তো একদিন শিশু ছিলাম, মনে নেই? কত বন্ধন ছিল আমাদের মধ্যে। আমাদেরও বলা হয়েছিল আমরা দেশের ভবিষ্যৎ, কিন্তু আমাদের বর্তমানে কি তেমন বন্ধন আছে? আমাদের পারস্পরিক চিন্তা ভাবনার এত অমিল কেন? আমাদের স্বাদের এত অমিল কেন? এত বিপরীত মানসিকতা নিয়ে আমরা দেশের ভবিষ্যৎ হতে পারব? আমার শিক্ষিত সহপাঠীর কাছে অনুরোধ নিজের কাছে প্রশ্ন করি, ‘আমরা কি পারব? যেখানে আমার সহপাঠী আজকে আমার অন্য সহপাঠীর কাছ থেকেই নিরাপদ নই।’

ইত্তেফাকের সঙ্গে থেকেই আমরা স্বাধীনতা জয় করেছি। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু আজ এই সময়ে আমাদের এত ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত ভাষার সম্মান কি আমরা রক্ষা করেছি?  ৫০ বছর আগের প্রজন্মের সবাই মিলে ত্যাগ স্বীকার করে এই অর্জন দিয়েছে, আর আজকে আমরা এই সুমধুর ভাষার চর্চা করতে পিছপা হচ্ছি। শহরতলিতে এই বিষয়টি আরো পরিষ্কার। মৌখিক ব্যক্তিত্ব বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আমরা এখন ইংরেজিকে ব্যবহার করি, আবার এই ইংরেজি শব্দ ভুল হলে চারপাশ থেকে লোক জন এসে ভুল ধরিয়ে দেয়, অথচ বাংলা ভাষার শুদ্ধ কি অশুদ্ধ উচ্চারণ হলো কি হলো না, ভাবার্থের বিকৃত ঘটল কি ঘটল না, এটা নিয়ে আমার প্রজন্মের মাথাব্যথা নেই। একটি আজব বিষয় হলো—বাংলা ভাষার যা-ই হোক, বাংলা সাংস্কৃতিক উৎসবকে কেউ ভোলে নাই। আমার প্রজন্ম এখন উৎসব পালনে মহিমা দেখাতে প্রস্তুত। হাস্যকর বিষয় হলেও সত্যি যে, সাংস্কৃতিক উৎসব কেউ না ভুললেও ভুলে গেছে সাংস্কৃতিক রীতিনীতি! ভাবা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত সহপাঠীরা আজকে নবীনদের বরণ করা থেকে শুরু সব অনুষ্ঠানে প্রায়গই অশালীনতা প্রকাশ পায়। আমার প্রজন্ম কি বাবা-মা গুরুজনের যথাযথ সম্মান করে? সমাজের বিকৃত চিন্তাভাবনাগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, আর আমরা সব বুঝেও তা অনুসরণ করছি। পারিবারিক নীতি শিক্ষা বলতে এখন কিছু নেই। সন্তান  থেকে পিতামাতার মধ্যে কেমন যেন একটা দূরত্ব চলে এসেছে। বয়স্ক পিতামাতাকে অথবা ছোট্ট শিশুর পরিচর্যার যাতে কমতি না হয়, এর জন্য আমার বাসায় লোক রেখে তাদের পরিচর্যা করি কিন্তু হঠাৎই একদিন পরিচর্যার জন্য শুধু ওই বহিরাগত লোকটি বা মেয়েটি ছাড়া আর কেউ বয়স্ক পিতামাতা অথবা সন্তানের কাছে থাকে না। সময়ের পরিক্রমায় আমার প্রজন্মের কাছে যুক্তিযুক্ত কারণ চলে আসে তাই তারা আর সময় দিতে পারে না। 

অনেক তো হলো নিজ প্রজন্মের সমালোচনা। এবার না হয় একটু উন্নতির দিকে তাকাই। কী দেখতে পাচ্ছি? বর্তমান সময়ে কার্যকর পরিবর্তন নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ। যদিও এদিকে আমরা পুরোপুরি সফল নই। আমরা আমাদের সমাজের বেশ কয়েকটি কুসংস্কারকে পরিবর্তন করে সংস্কার করেছি। নারীশিক্ষা আজ আশানুরূপ। ছোটবেলায় দেখতাম স্কুল কলেজের ফলাফল প্রকাশ পেলে পত্রিকায় শুধু মেয়েদের ছবি দিত, কিন্তু এটার উদ্দেশ্য এখন আমরা বুঝতে পারি। এখন হয় তো ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে ছবি ছাপা যেতে পারে। নারী ক্ষমতায়ন আজ দৃশ্যমান। সংবাদ পত্রিকার সঙ্গে থাকলে আমরা এই দীর্ঘ সময়ের পরিবর্ধন পরিমার্জনগুলো লক্ষ করতে পারি বর্তমান প্রজন্মের অবদান। নিজের মতপ্রকাশেও এখন আমরা পিছপা হতে ভয় পাই না। প্রযুক্তির ব্যবহার আমরা শিখে গেছি। আমরা অন্যায়কে আর সহ্য করি না। এই সত্সাহস আমাদের প্রজন্ম জাগ্রত করেছে। নিজের অধিকার আদায় আমরা শিখেছি। শিক্ষার সঠিক ব্যবহার আমাদের হাত ধরেই আগাচ্ছে। আমরা আশা রাখি সুন্দর ভবিষ্যতের। আমরা মানুষকে আশার আলো দেখাই, দেখাব। 

পরিশেষে ‘দৈনিক ইত্তেফাককে অভিনন্দন,আমাদের ৬৯ বছর ধরে বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত রাখার জন্য। এতগুলো দিন আমাদেরকে সঠিক তথ্য দিয়ে আমাদের চিন্তা ভাবনার বিকাশের জন্য। ইত্তেফাককে আহ্বান জানাব আমার এই প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে সঠিকভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। আর আমরা হব পত্রিকা ও মানুষের মনের রঙিন প্রচ্ছদ। 

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়