অন্যান্য লাইন, রিংরোড, রেডিয়াল রোড হলে চাপ কমবে ঢাকার কেন্দ্রে

ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর, যেখানে ঢাকা মহানগর অঞ্চলে জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি এবং রাস্তার আয়তন প্রায় ছয় শতাংশ, যা যে কোনো শহরের নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী অনেক কম। জনবহুল যে কোনো শহরের যানজট নিরসনে দরকার সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা এবং এর বিন্যাস অনুযায়ী বিন্যস্ত হবে শহরের ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা। 

ঢাকা শহরে এতদিন পরিবহন ব্যবস্থা বাস, অযান্ত্রিক যানবাহন এবং পায়ে হাঁটার ওপর নির্ভরশীল ছিল। সাধারণত যে কোনো নগরের জনসংখ্যা ৩ মিলিয়নের বেশি হলেই সেই শহরের মেট্রোরেল কার্যক্রম ভূমিকা পালন করে। ঢাকা জনসংখ্যার আয়তন অনুসারে মেট্রোরেল যুগের সূচনা আরো বিশ বছর আগেই হতে পারত। তথাপি বর্তমান সরকার কর্তৃক রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের সুপারিশ অনুযায়ী রাজউকের উত্তরা তৃতীয়-পর্ব প্রকল্প এলাকা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যা এমআরটি-৬ করিডর হিসেবে বিবেচিত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং এরই প্রাথমিক ধাপ হিসেবে উত্তরা তৃতীয়-পর্ব প্রকল্প এলাকা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (মেট্রোরেল) চালু হচ্ছে। 

মেট্রোরেল পরিবহন ব্যবস্থার মূল সুবিধা হলো অধিক মানুষ কম সময়ে যাতায়ত করতে পারে, পরিবেশবান্ধব পরিবহন এবং ব্যক্তিগত গাড়ির প্রতি নির্ভরশীলতা কমে কিন্তু অসুবিধা হলো মেট্রোরেলের মাধ্যমে মানুষকে ডোর টু ডোর সেবা প্রদান করা যায় না। সেজন্য মেট্রোরেল স্টেশনে হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, পার্কিং সুবিধা এবং অন্যান্য পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ ব্যতীত এই গণপরিবহন ব্যস্থার মূল সাফল্য পাওয়া যাবে না। সেজন্য প্রয়োজন স্টেশনকেন্দ্রিক উন্নয়ন, যা টিওডি (ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট) নামে পরিচিত। এছাড়াও মেট্রোরেলের পরিচালন ব্যয় বেশি বিধায় শুধু যাত্রী ভাড়া থেকে সব পরিচালনব্যয় জোগান সম্ভব নাও হতে পারে। সেজন্য এই সেবা পরিবহন সেবা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে নন-রেল ব্যবস্থা থেকে পরিচালন ব্যয়ের জোগান করতে হবে, যা কেবল স্টেশনকেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। সেজন্য দরকার টিওডি বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ এবং একটি নীতিমালা প্রয়োজন। 

আশার বিষয় হলো, রাজউক কর্তৃক প্রণীত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (২০২২-২০৩৫) এ স্টেশনকেন্দ্রিক উন্নয়নের জন্য বোনাস ফার প্রদানসহ একটি গাইড লাইন দেওয়া হয়েছে। এই গাইড লাইনকে আরো সুবিন্যস্তকরণ এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা দেওয়ার জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মেট্রো স্টেশনকে কেন্দ্র করে ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মিশ্র ব্যবহারকে উত্সাহিতকরণ এবং উচ্চ ঘনত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে নন-রেল বাণিজ্যর মাধ্যমে পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ আদায় করা সম্ভব হবে।

এছাড়া, ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (২০২২-২০৩৫) এবং আরএসটিপিতে বর্ণিত মেট্রোরেলের অন্যান্য করিডর লাইন-১, লাইন-৫ এবং রিংরোড ও রেডিয়াল রোডসমূহ বাস্তবায়ন হলে কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর চাপ হ্রাস হবে এবং ঢাকার চারপাশে ছোট ও মাঝারি শহর নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এ লক্ষ্যে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় মেট্রোরেল ব্যবহারের মাধ্যমে শহর বিকেন্দ্রীকরণের যে সুযোগ সৃষ্টি হবে তার সেই লক্ষ্যে অর্জন হবে না। ঢাকার মতো জনবহুল শহরে যানজট নিরসনে ম্যাস ট্রানজিট, উন্নত পাবলিক বাস চালুকরণ এবং রিংরোড নির্মাণের উদ্যোগ অনেক আগেই গ্রহণ করা উচিত ছিল। যদিও মাস ট্রানজিট (মেট্রোরেল) ব্যবস্থার জন্য অর্থায়ন, ডিপোর জন্য জায়গা নির্ধারণ, ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক প্রতিস্থাপন করা অনেক চ্যালেঞ্জের বিষয়। তথাপি বর্তমান সরকার দৃঢ়তার সঙ্গে এই পরিবহনসেবা ঢাকা শহরে সূচনা করেছেন, যার জন্য বর্তমান সরকারকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই।

লেখক : নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকল্প পরিচালক (ঢাকা নগর পুনঃ উন্নয়ন প্রকল্প), রাজউক, ঢাকা