ইত্তেফাকের কাছে প্রত্যাশা

সত্তরে ইত্তেফাক তার সাহসী পা রাখল। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু আর ইত্তেফাকের বয়স প্রায় কাছাকাছি হলো। তাই, আমি যেমন পিতামহ, পিতাকে ইত্তেফাক পড়তে দেখেছি, তেমনই শুধু আমি নিজেও পড়ি না, আমার সন্তানেরাও পড়ে। সেই বিচারে পরম্পরা চার প্রজন্ম ইত্তেফাকের পাঠক। ইত্তেফাকের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়ায় ছোটবড় কয়েক হাজার দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হলেও এবং তাদের অধিকাংশ কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও ইত্তেফাকের অগ্রযাত্রা এখনো অটুট। ‘ক্ষুদ্র তেলাপোকাও বাঁচে, বিশালাকার ম্যামথও হারিয়ে যায়।’ না, বেঁচে থাকবার জন্য বেঁচে থাকা নয়, বরং ইত্তেফাক বেঁচে আছে তার বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞে, সামাজিক দায়বদ্ধতায়। আজকের পাঠক অনেক পরিণত। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে পাঠক ২৪ ঘণ্টাই দেশ-বিদেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দেশ-বিদেশের নানামুখী খবরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারছে। মণিকাঞ্চন হিসেবে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। এসব মাধ্যমে অর্জিত তথ্য-উপাত্ত সংবাদপিপাসু পাঠককে হালনাগাদ রাখছে। ইত্তেফাক এই সচেতন, বহুচোখ-সংবলিত, স্থিতধী, রুচিশীল, পরিশীলিত পাঠকের প্রত্যাশা মিটিয়ে চলছে।

আয়নায় আমরা মুখ দেখি। পত্রিকাকে সমাজের দর্পণ বলা হয়। পাঠক হিসেবে আমার আশাবাদ এই পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ নীহারিকাবাসী নন। তারা ভূমিপুত্র, এই মাটিরই সন্তান। ইত্তেফাকের কর্মযজ্ঞ বিশাল ও ব্যাপক। এই পত্রিকার মুকুরে ধরা পড়ে আসছে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো, রাজনৈতিক মনন, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অবয়ব বিনির্মাণেও ইত্তেফাকের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রের মতো, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা রাজধানীতে থাকলেও চৌষট্টি হাজার পল্লিতেই এর শিকড় প্রোথিত। আগামী বছর নির্বাচনকে ঘিরে যে সমীকরণ তৈরি হয়েছে, ইত্তেফাক বিশেষ কারো সেবাদাস বা মতবাদের ক্রীড়ানক না হয়ে নির্মোহ সংবাদ পরিবেশন করবে, এই আশাবাদ সবার।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশের ইতিহাস মাত্র তিন দশক। কিন্তু, দেশকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বুনিয়াদের ওপর দাঁড় করানোর জন্য এই শিল্পের রয়েছে অপার ভূমিকা। শুধু গার্মেন্টস দ্রব্যাদি রপ্তানির মাধ্যমেই মূল্যবান বিদেশি মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি লাখ লাখ হতদরিদ্র নারীসহ অনেক পরিবারের রুটিরুজির সংস্থান করে দিয়েছে এই মাধ্যম। তাই এই শিল্পের আরো বিকাশ সাধন করতে হলে যাতে আর কোনো ‘রানা প্লাজা’ সৃষ্টি না হয়, সেই দূরদর্শী চোখ দিয়ে পত্রিকাটি আমাদের আলোকিত করবে, আগাম বার্তা দেবে পাঠক হিসেবে সেই আশাবাদ রইল।

মানুষ বিপদের শেষ অবলম্বনের জন্য সঞ্চয় করে। সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে মূলত ব্যাংককেই বেছে নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণভ্রমরই তার ব্যাংকিং খাত। সময়কালে এই খাতে বিভিন্ন অনিয়মের সংবাদ নাগরিক হিসেবে আমাদের চিন্তিত করেছে। ব্যাংকে জামানতকারী ক্ষুদ্র থেকে বড়, সে যেই হোক না কেন, তাদের মনের ভীতি দূর করার জন্য তস্করদের স্বরূপ উন্মোচন করা প্রয়োজন। শেয়ারবাজারের পর্দার আড়ালের কুশীলবদের অঙ্গুলিহেলনে হাজারও মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছেন। আত্মহননের পথও বেছে নিয়েছেন অনেকে। মানিক মিয়ার যোগ্য উত্তরসূরিগণ এই নীরব ঘাতকদের কূটচাল প্রকাশ করার কাজটি দক্ষ হাতে করবেন সেই আশাবাদও রইল।

আমাদের প্রবাসীরা তাদের শ্রমলব্ধ মূল্যবান বিদেশি মুদ্রা দেশে পাঠান। এই টাকা পাঠানোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ত্যক্ত-বিরক্ত প্রবাসী প্রায়ই হুন্ডির আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ফলে দেশ মূল্যবান রেমিট্যান্স থেকে যেমন বঞ্চিত হয়, তেমনই প্রবাসীরা তাদের ঘামের গন্ধমিশ্রিত অর্থ স্বজনদের কাছে সময়মতো পৌঁছবে কি না, সেটি ভেবে দারুণ উত্কণ্ঠায় থাকেন। এই অচ্ছেদ্য চক্র ভাঙার জন্য ইত্তেফাকের কলম আরো ক্ষুরধার হয়ে উঠুক। বিদেশে চাকরি দেওয়ার নাম করে দরিদ্র মানুষের শেষ সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া আদম ব্যাপারীদের ঠিকুজি দেশবাসীকে জানানো দরকার। সময়কালে ডলার বাজারের অস্থিরতায় এলসি খোলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। এর অল্প এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব তৃণমূল থেকে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের মধ্যে পড়ে। ফলে আমদানি-রপ্তানির ‘ব্যালান্স’ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ভবিষ্যতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গণমাধ্যমের দিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাকিয়ে আছে।

বিগত সময়কালে করোনা আমাদের শরীরেই শুধু নয়, মনোজগতেও বাসা বেঁধেছিল। নতুন করে করোনা বিস্তারের খবর পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইত্তেফাক ভয় নয়, সচেতনতা সৃষ্টি করবে। এই আশাবাদ শুধু স্বাস্থ্যকর্মীদেরই নয়, সকল  দেশবাসীর। সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ নামক পুরোনো দৈত্য প্রায়ই বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এর প্রভাব নিছক রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয় বরং বহুমুখী। হতাশার কথা হলেও সত্য এদের রিক্রুটিংয়ের টার্গেট গ্রুপে শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, কোমলমতি শিশু-কিশোর, পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রী, গৃহবধূ থেকে শুরু করে উঁচু পর্যায়ের চাকরিজীবী থেকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও আছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষের ভাবাবেগকে পুঁজি করে মগজ ধোলাই-ই তাদের স্ট্র্যাটেজি। এদের কূটকৌশল এখনই পুরোপুরি বন্ধ না করতে পারলেও, সহনীয় মাত্রায় আনতে না পারলে হলি আর্টিজানের মতো নারকীয় ঘটনা ঘটানোর জন্য তারা অপচেষ্টা চালিয়ে যাবে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে ইত্তেফাকের লড়াই দেশ স্বাধীন হওয়ার দিন থেকেই। পাঠক ইত্তেফাকের সেই পথচলাকে আরো বেগবান দেখতে চায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দীর্ঘজীবন পরিক্রমণ শেষে মৃত্যুসজ্জায় শুয়ে স্থিতধী প্রাজ্ঞ কলমে তার সারা জীবনের কর্মজীবনের কর্মযজ্ঞের আত্মমূল্যায়নে লেখেন তার দশদিক কাঁপানো আত্মজৈবনিক মূলক কবিতা ‘ঐকতান’। সেখানে কবি হিসেবে তার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে লেখেন, ‘চাষি খেতে চালাইছে হাল,/ তাঁতি বসে তাঁত বুনে, জেলে ফেলে জাল।/ বহুদূর প্রসারিত এদের বিচিত্র কর্মভার/ তারই পরে ভর দিয়ে চলিতেছে সমস্ত সংসার।’ বাংলাদেশ নামক এই সংসারের এই জনপদে অর্থনীতির প্রাণশক্তি তার চাষি, তাঁতি, জেলেসহ নানা শ্রেণির কর্মজীবী মানুষ। নিরপেক্ষ নয়, এই পত্রিকা শ্রমজীবী মানুষের পক্ষ নিয়ে এসেছে, নিচ্ছে এবং আগামীর দিনেও নেবে—পাঠক হিসেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট, ফার্মাকোলজি