নদীতে নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে

কৃষিনির্ভর এ দেশে ফসলের জন্যে প্রয়োজনীয় পানি নদীর কাছ থেকে পেয়ে থাকি। কিন্তু আমরা যেভাবে নদী দূষিত ও দখল করছি তা ভয়ংকর এক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। প্রতিবছর নদীর দৈর্ঘ্য কমছেই। এ পর্যন্ত কমেছে প্রায় ১৯,২০০ কিলোমিটার। বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় আছে ৩৮৩টি নদী। এ নদীর অনেকগুলোর অবস্থাও সংকটাপন্ন। নদ-নদী ও প্রাকৃতিক খাল রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে সরকার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করে। কিন্তু তাঁদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তেমন একটা নজরে আসে না। দূষণ ও ভূমিদস্যুদের আগ্রাসনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, সেতু কালভার্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে অনেক নদীর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে। অধিকাংশ এলাকায় ছোট ছোট কালভার্ট-ব্রিজ অনেক নিচু করে বানানো হয়েছে যার ফলে তার নিচে দিয়ে বড় কোনো নৌকা বা লঞ্চ চলাচল করতে পারে না। আর যদি করেও, অনেক বড় বিপদের আশঙ্কা থাকে।

বাংলাদেশে মোট নৌপথের দৈর্ঘ্য ২৪,০০০ কিলোমিটার হলেও নৌপরিবহনযোগ্য নৌপথের দৈর্ঘ্য বর্ষাকালে ৫৯৬৮ কিলোমিটার আর শীতকালে দাঁড়ায় ৩৮৬৫ কিলোমিটার। বাংলাদেশের প্রধান নদীবন্দরগুলোর মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা অন্যতম। এছাড়াও ভৈরববাজার, আশুগঞ্জ, চাঁদপুর, ঝালকাঠি, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে নদীবন্দর রয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নৌপথ রক্ষায় একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের আওতায় রয়েছে ১৭৮টি নদী। ২০১৯ সালে অনুমোদন হওয়া এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা আছে ২০২৫ সালের মধ্যে। পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ড্রেজিং মেটারিয়াল বা উত্তোলিত বালু নদী বা নদীর পাড়ে ফেলা যাবে না। কিন্তু ড্রেজিং প্রকল্পে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ নদীতে ফেলা হয়েছে। ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ নদীর পাড়ে এবং ২৭ দশমিক ১০ শতাংশ ফেলা হয়েছে কৃষিজমিতে। নির্দেশনা না পালন করায় নদী আবার ভরাট হচ্ছে। এতে কিছুদিন পরেই আবার নদীতে নব্যতা সংকট দেখা দেবে।

নদীপথে পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া সড়কপথ থেকে অনেক সুবিধা এবং ব্যয়ও তুলনামূলক অনেক কম। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি টন কার্গো পরিবহনে প্রতি কিলোমিটারে যেখানে সড়কপথে ব্যয় সাড়ে ৪ টাকা। রেলপথে এই খরচ আড়াই টাকা এবং নৌপথে খরচ মাত্র ১ টাকা। অভ্যন্তরীণ নদীপথ ব্যবহার করার কারণে প্রতি বছর বাঁচানো যেতে পারে পাঁচ কোটি ৮৫ লাখ লিটার ডিজেল। প্রকৃতিতে বেঁচে যায় এক লাখ ৫৫ হাজার টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড। আর এ কারণে নৌপথ সংরক্ষণ করা না হলে ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। নৌপথগুলোর নাব্যতা রক্ষা করা গেলে কৃষিতে বছরে এক হাজার ১৯৭ কোটি ৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা এবং মৎস্য খাতে তিন কোটি ৬৯ লাখ ১৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত আয় হতো। আর নৌপথের মাধ্যমে বছরে আয় হতো ১৩৭ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার টাকা। ভাঙন প্রতিরোধের ফলে সাশ্রয় হতো ১১ কোটি ২১ লাখ ৫১ হাজার টাকা; অর্থাৎ শুধু বড় ছয়টি নদীপথ খনন করে নাব্যতা ধরে রাখা গেলে বছরে প্রায় ১৪০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো।

বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে তিস্তা ব্যারেজ ও ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির প্রবাহের অনেক তারতম্য লক্ষণীয়। পানি প্রবাহ ঠিকমতো না হওয়ায় চর ভেসে উঠছে। তাছাড়া সব ধরনের বর্জ্যপদার্থ নদীর পানিতে ফেলায় নদী তার সজীবতা হারিয়ে ফেলছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু ঢাকার চার নদী ও খালে-বিলে পাওয়া গেছে প্রায় ৭২ হাজার টন বর্জ্য। এ বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে নদী ও পরিবেশের জন্যে হুমকি।

ঢাকা থেকে বরিশালের নৌপথের দূরত্ব ১৬৮ কিলোমিটার। যাত্রাপথে সময় লাগে প্রায় ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা। নদী দখল এবং নদীর পাশের চর সৃষ্টির জন্যে নৌযান অনেকটা ঘুরে যায়। নিয়মিত নদী খননের পাশাপাশি নদীগুলোকে ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদী দখল রোধে। যাতে করে আমাদের নদীগুলো বাঁচতে পারে।

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়. ময়মনসিংহ