ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নতুন বছরের ভাবনা

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া যখন ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু করে তখন সবাই ধরে নিয়েছিল এটি স্বল্পস্থায়ী হবে। বছর শেষ হয়ে গেল, যুদ্ধ থামেনি। বরং রুশ বাহিনী আক্রমণের মাত্রা তীব্র করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর জন্য ইতিমধ্যেই এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ যদি এভাবে চলতেই থাকে তাহলে ইউরোপের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে। ইউক্রেন যেন ইউরোপ তথা পশ্চিমা দুনিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা ব্যূহ। কিন্তু রাশিয়া এই ব্যূহ এখন ফুটো করে দিয়েছে।

২০২২ বছরটি যেভাবেই যাক, ২৩-এ এসে পশ্চিমকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবেই। রাশিয়াকে কি এভাবে চলতে দেওয়া হবে, না এর রেশ টেনে ধরতে হবে সে ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে ইউক্রেন। ইউরোপের সীমান্ত রক্ষার জন্য দেশটির ২৫ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যে কোনো অগ্রগতি শুধু ইউক্রেন নয়, ইউরোপের জন্য ইতিবাচক খবর। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংহতি অনেক দিন ধরেই শিথিল হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমা গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ইউক্রেন বিপুলসংখ্যক রুশ সামরিক ইউনিট ধ্বংস করেছে, যেগুলো পুনর্গঠিত করতে রাশিয়ার অনেক বছর লেগে যাবে। যুদ্ধে ইউক্রেনের লাখ লাখ মানুষ দেশান্তরী হয়েছে। ফলে ইউক্রেনের স্বাভাবিক খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বেড়ে গেছে। বিষয়টি ইউরোপসহ সারা বিশ্বের জন্যই এক সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ২২ সালে মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড পরিমাণ বাড়ে। তাছাড়া বছরটিতে আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তার জন্য বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ ধনীর মোট সম্পত্তির পরিমাণ হ্রাস পায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে রুশ জ্বালানি খাতকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়। এসব নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে রাশিয়াকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করা গেলেও রুশ অর্থনীতিকে কাবু করা যায়নি। বরং বছর জুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকায় তা থেকে লাভবান হয় রাশিয়া। ২০২৩ সালে রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে না পারলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে আরো মাশুল গুনতে হবে।

এই যুদ্ধ ইউরোপের মানসপটেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ইউরোপের দোরগোড়ায় এমন যুদ্ধ দেখতে হবে সেটি নিশ্চয়ই কোনো ইউরোপীয় আশা করেনি। যুদ্ধ হলেও সেটি এতদিন ধরে চলতে পারে সেটি তাদের হিসাবের মধ্যে ছিল না। এক বছর আগেও যেখানে জার্মানি রাশিয়ার গ্যাস পাইপলাইন নর্ড স্ট্রিম টু বাস্তবায়ন নিয়ে আশাবাদী ছিল এখন সে আশা তাদের জন্য সুদূরপরাহত। এক বছরে রুশ জ্বালানির ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা যথেষ্ট কমেছে। যুদ্ধ বন্ধের কোনো উদ্যোগ এখনো পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। চলতি বছর পশ্চিমাদের এ লক্ষ্যে কিছু না কিছু করতেই হবে। এই যুদ্ধে রাশিয়া যদি জিতে যায় সেটি শুধু রাশিয়া নয়—চীন, উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলোর মনোবলকেও চাঙ্গা করবে। পশ্চিমা দেশগুলোকে নতুন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। যুদ্ধের সর্বশেষ জানা গেছে, ইরানের ড্রোন দিয়ে রুশ বাহিনী কিয়েভে আক্রমণ করেছে। ২৯ ডিসেম্বর রাতে ঐ হামলা চালানো হয়। ইউক্রেন অবশ্য সবগুলো ধ্বংস                  করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। নববর্ষের আগের  রাতটিতে ইউক্রেনে প্রতিবারের মতো আলোকসজ্জা বা আতশবাজি হয়নি। কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন স্থান অন্ধকারে ডুবে ছিল।

সব মিলিয়ে বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ইউক্রেন যুদ্ধ ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পে যেন নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো বিষয়টিকে কি স্বাভাবিকভাবে নেবে? হোয়াইট হাউজ অবশ্য গত মাসের গোড়ার দিকেই এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিল। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সমম্বয়ক জন কিরবি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে, ইরান যে রাশিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন রকম সরঞ্জামাদি দিয়ে সহায়তা করছে, তার প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলায় ইরানি যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে রাশিয়া। প্রশ্ন হলো—এসব হুঁশিয়ারি কি কেবল কথার কথা। না রাশিয়াকে অগ্রযাত্রা রুখে দেবে পশ্চিমারা, ২৩ সালে তাদের এ ব্যাপারে কিছু করে দেখাতে হবে। ২২ সালে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাশিয়ার কর্মকাণ্ড অনেকটা নীরবতার সঙ্গে দেখেছে, নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। চলতি বছরও যদি সেভাবেই চলে তবে শুধু উন্নত পশ্চিমা বিশ্বকে নয়, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এর জের টানতে হবে। তাই এটি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ অগ্রাধিকার হতে হবে।