বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে বিদেশিদের আগ্রহ জন্মাতে সময় লাগবে। কারণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সেই ভাষার প্রতি বিদেশিদের আগ্রহী হয়ে ওঠার সম্পর্ক থাকে। তবে, এ ধরনের আয়োজন বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে বিদেশিদের আগ্রহী করে তুলবে। উৎসব নিয়ে আলোচনায় এমনটাই বলছিলেন সাহিত্যিক মোজাফফর হোসেন। উৎসব প্রসঙ্গে লেখকরা বলেন, এ উৎসবে বিদেশিরা আসেন তার চেয়ে বেশি বাংলাদেশি সাহিত্যিক পাঠকরা আসেন। ফলে এ উৎসব প্রাঙ্গণ হয়ে উঠছে দেশি-বিদেশি লেখক, প্রকাশক, পাঠক ও বিজ্ঞানীদের মিলনমেলা।
উৎসব প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেল সত্যিকার অর্থেই দেশি-বিদেশি পাঠক-লেখকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন বইয়ের স্টলে বর্ধমান হাউজের সামনের খোলা চত্বরে আড্ডায় মুখরিত ঢাকা লিট ফেস্ট। প্রধানত তরুণরাই লিট ফেস্টের প্রাণ। লিট ফেস্টে বইয়ের টানে, লেখকের টানে আসছেন তারা। বিশ্বখ্যাত লেখকদের আকর্ষণেও ছুটে এসেছেন অনেকে। ঢাকা লিট ফেস্ট মাতিয়ে রেখেছেন তরুণরাই। সব অধিবেশনেই তারা শুনছেন দেশ-বিদেশের লেখকদের কথা। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে নানা জনের সঙ্গে মেতে উঠছেন আড্ডায়। ঢাকা লিট ফেস্ট দেশের তরুণদের জন্য সত্যিকার অর্থেই আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্যের আঙিনা হয়ে উঠেছে। গত দুই দিনে বিভিন্ন সেশনে দেশি-বিদেশি লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সমালোচকদের আলোচনায়, আড্ডায় মুখর হয়ে উঠেছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ।
ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায বললেন, বিশ্ব সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী প্রজন্মের জন্য একটি প্ল্যাটফরম সৃষ্টি করা গেছে। ১৩ বছর আগে যখন শুরু হয় তখন মনে সাহস ছিল। আমাদের উদ্দেশ্য নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু এর ফলাফল এখন সবার চোখের সামনে।
গতকাল শুক্রবার বাংলা একাডেমি লন চত্বরে আধ্যাত্মিক সুরের মূর্ছনায় শুরু হয় ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনের। গতকাল শুক্রবার সকালে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে লন চত্বরে শাহ সুফি সরদার আমির উদ্দিন চিশতীর সুফি সংগীত পরিবেশন করেন সরদার আফসার উদ্দিন। তবে, দ্বিতীয় দিনের সকাল ছিল ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ ও নুরুদ্দিন ফারাহ এবং কোভিড ১৯-এর টিকা অ্যাস্ট্রাজেনেকার সহ-উদ্ভাবক সারাহ গিলবার্টের আলোচনায় মুখর।
রোহিঙ্গা কবিদের দেশে ফেরার আকুতি
ঢাকা লিট ফেস্টে এসে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন রোহিঙ্গা কবিরা। গতকাল শুক্রবার লিট ফেস্টের বর্ধমান হাউজে উপস্থিত হয়ে ‘অলটারনেট ভয়েস’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এমন আকুতির কথা জানান রোহিঙ্গা কবি ও ফটোগ্রাফার আব্দুল্লাহ হাবীব, শাহিদা উইন ও আইলা আক্তার।
বর্তমান বিশ্বে রোহিঙ্গা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত জনগোষ্ঠী উল্লেখ করে কবি আব্দুল্লাহ হাবীব বলেন, ‘আমি কবিতার মাধ্যমে আমাদের দুঃখ কষ্ট মানুষের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছি। আমাদের একমাত্র বাড়ি মিয়ানমার, আরাকান। আমরা সেখানে ফিরে যেতে চাই।’ মঞ্চে স্মৃতিকাতর হয়ে তিনি তার লেখা ‘গিভ মি এ চার্জ’ শিরোনামে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন।
সেশনের আরেক আলোচক রোহিঙ্গা কবি শাহিদা উইন বলেন, আমি কবিতার মাধ্যমে আরাকানে কেমন ছিলাম এবং বাংলাদেশে কেমন আছি, সেটাও তুলে ধরেছি। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
রোহিঙ্গা নারীদের নিয়ে কাজ করা আইলা আক্তার বলেন, ‘এটা সত্যি আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। এত বড় একটা অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি আনন্দিত। আমি বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশ যদিও আমাদের দেশ না, তবু আমরা এখানে অনেক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। কিন্তু আমরা আমাদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চাই।
লেখকের দায়িত্ব সত্য যেমনই হোক তা তুলে ধরা: অমিতাভ ঘোষ
ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাঙালি লেখক অমিতাভ ঘোষ বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন পরিবেশে কিছু অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটছে। কেবল এ অঞ্চলে না, ভেনিস বা মিয়ামিতেও বন্যা হচ্ছে, সান ফ্রান্সিসকোর রাস্তায় ম্যানহোল ফেটে পানির ফোয়ারা উঠছে। এসবের পেছনে মানুষই দায়ী। মানুষ পরিবেশকে যা দিচ্ছে, তা-ই আমাদের এমন অদ্ভুত সব কাণ্ড দেখতে বাধ্য করছে। লেখকের দায়িত্ব হলো—সত্য যেমনই হোক তা তুলে ধরা।
তিনি বলেন, জীবনের একপর্যায়ে তার মনে হয়েছিল বর্তমান দক্ষিণ এশীয় ঔপন্যাসিকরা আধুনিক হওয়ার প্রয়াসে পশ্চিমা ধারা অনুসরণ করছেন। কিন্তু জীবন ও পরিবেশের সম্পর্কের জটিলতা এই ধারায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এই অভাববোধ থেকে লেখক শেকড়ের সন্ধান করেছেন। তিনি মনসামঙ্গল কাব্য, পদ্মপুরাণ পড়েছেন। তিনি মনে করেন, এই পুরাণগুলোর কাব্যিক ধারা, বর্ণনাভঙ্গি ও চারিত্রিক উপস্থাপন আমাদের জটিল আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপট তুলে ধরার জন্য বেশি উপযোগী। শেকড়ের এই অ-আধুনিক ধারা থেকেই তিনি লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনে ‘হাচ ক্রসওয়ার্ড অ্যাওয়ার্ড ফর ফিকশন’ জয়ী উপন্যাস ‘দি হাংরি টাইড’ নিয়ে আলোচনার সেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
অমিতাভ ঘোষ বলেন, ‘কলোনিয়ালিজমের আগ্রাসন পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। ইন্দোনেশিয়ার বান্দা দ্বীপের জনগোষ্ঠীকে হত্যা করে ও দাস বানিয়ে দাস মশলা ব্যবসায় ডাচদের আধিপত্য অর্জিত হয়। শুধু তখন নয়, জীবাশ্ম জ্বালানি ও উদ্ভিদ-কেন্দ্রিক রাজনীতি সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ছিল। আমাদের শেখানো হয়েছে শিল্পায়ন বা ব্যবসার মতো কেবলই মানবকেন্দ্রিক ধারণা ‘উন্নতি’ বা ‘উন্নয়ন’, যেখানে কোনো আত্মিক সংযোগ নেই।’
ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায-এর সঞ্চালনায় উঠে আসে লেখকের পদ্মা পার থেকে ইতালির ভেনিস, বিহার, শৈশবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আড়িয়াল খাঁ, কীর্তিনাশা, উন্মত্ত পদ্মার স্মৃতি।
তিনি বলেন, প্রকৃতিকে ধ্বংস করার সক্ষমতা মানুষের নেই। মানুষ পরিবেশের যা-ই ক্ষতি করুক, প্রকৃতি তার সবটাই ফিরিয়ে দিবে। ফলে নিজেরা ভালো থাকতে পরিবেশের ভালো চাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।