বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও তার মূল্যায়ন

গতকাল ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন। তাৎপর্যপূর্ণ দিনই বটে। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সর্বস্তরের জনগণকে দেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তরিকভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান এই ঘোষণায়। এর পরপরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তার অদম্য নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। পরাজিত পাকিস্তানি শাসকরা অবশেষে বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তার মুক্তির মধ্য দিয়ে বাঙালির বিজয় পূর্ণতা লাভ করে।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা। তিনি যদি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে না আসতেন, যদি পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা তাকে হত্যা করত, তাহলে আমরা আজকের এই বাংলাদেশ পেতাম না। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মানুষের মনে ছিল শঙ্কা ও বিষাদের ছাপ। এ ছাড়াও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শারীরিক উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। সেদিন বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি যে কতটা প্রয়োজন ছিল, তা বর্তমান সময়ে বসে অনুভব করা যাবে না। ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত একটি  নৈরাজ্যের মতো অবস্থা ছিল ২৫টি দিন। তিনি না এলে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিতেন কিনা সন্দেহ। ভারতীয় সৈন্যও হয়তো অত তাড়াতাড়ি ফিরে যেত না। অনেক দেশের স্বীকৃতি পেতেও বেগ পেতে হতো। তার প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আরো সংহত হয়। ১০ জানুয়ারি আসলে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিপূর্ণতা লাভের দিন। এদিন দেশবাসী তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে প্রাণভরে বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করেন। এদিন থেকে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রবেশ করে গণতন্ত্রের এক আলোকিত অভিযাত্রায়।

তোফায়েল আহমেদ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, ‘১৬ ডিসেম্বর প্রিয় দেশ শত্রুমুক্ত হলেও তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আমরা জানতাম না। যেদিন ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংবাদ জানলাম, সেদিন এক অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সারা দেশে। মানুষের যে কী আনন্দ, তা ভাষায় ব্যক্ত করার নয়।’ 

রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আত্মমর্যাদাবোধ এবং দেশবাসীর সম্মানকে তিনি যেভাবে দেখেছেন, তার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। ইতিহাসকে বিচার করতে সময়ের নিরিখে। আজ আমরা অনেক কথাই বলতে পারি। কিন্তু সেদিনের ঘটনাগুলোকে মূল্যায়ন করা উচিত সেই সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য রেহমান সোবহান সেই সময়ের মূল্যায়ন করে বলেছেন, ‘সাধারণ লোকজন তো শুধু মনে করেছে একটা যুদ্ধের মধ্যে আমরা স্বাধীন হয়ে গেছি। আমাদের আর ভাবনাচিন্তা কী। আমাদের নাগালে সবকিছুই চলে আসবে। দেশের ঐসব সাধারণ লোকের মধ্যে এ ভাবনাটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুর প্রতি জনগণের ভালোবাসা ছিল তীব্র। মানুষ মনে করত, তিনি সবকিছু করে ফেলতে পারবেন। সত্যিকার অর্থে ১৯৭২ সালে আমাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস বা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ধ্বংস, রাস্তাঘাট ধ্বংস, দুটি বড় বড় ব্রিজ পাকিস্তান সাবোট্যাজ করে চলে যায়। হাইওয়েতে কোনো গাড়ি চলে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তবে মূল সমস্যা ছিল পাকিস্তানি ব্যবসায়ীসম্প্রদায়, পূর্ববাংলার অর্থনীতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারা একসঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য গুটিয়ে পাকিস্তান চলে যায়। মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ীসম্প্রদায় পাকিস্তান আমলে এদেশের ইকোনমি নিয়ন্ত্রণ করেছে, পূর্ববাংলার ভেতর ও বাইরে থেকে। ইকোনমি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো হলো সব বড় বড় কারখানা, ব্যাংক, ইনসিওরেন্স কোম্পানি, ট্রেডিং, পাটের ব্যবসা সব তো অবাঙালিদের হাতে ছিল। হঠাত্ করেই ১৬ ডিসেম্বরের আগে সবকিছু গুটিয়ে তারা চলে যায়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠার পর খুব কম দেশেই এ রকম অবস্থা হয়েছিল। ইতিহাসে এ রকম নজির নেই বললেই চলে। শিগিগরই আমরা কিছু একটা দাঁড় করাতে পেরেছিলাম, এটাই তো অনেক। তারপর তিন বছরের মধ্যে সব কিছু কি গোলাপ বাগান হয়ে যাবে, এটা তো সম্ভব নয়। যতকিছু  হয়েছে, সবই চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্যে হয়েছে। তবে হয়েছে অনেক কিছুই, ওটা তো সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য, তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন প্ল্যানিং কমিশন নিয়ে। তার নজরে ছিল কীভাবে দেশের মজবুত অর্থনীতির ভিত রচনা করা যায়। তবে তার আরো চাপ ছিল ডোনারের সঙ্গে, আমেরিকা তো ফুড শিপমেন্ট বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশে। ঐ সময় ফুডের একটা সংকট বাইরে থেকে চলে আসে, ফলে সবকিছু তো তাকেই সামলাতে হচ্ছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে তখন আমরা এগোচ্ছিলাম। দেশ ও দেশের বাইরের নানা বৈরী পরিস্থিতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সামাল দিতে হচ্ছিল। তবে এর মধ্য থেকেও সবার সঙ্গে তিনি পারসোনাল সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ‘...যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন, তবে সাড়ে তিন বছরের কষ্টের ফসলের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির মজবুত ভিত তৈরি হতো (বণিকবার্তা, ১০ জানুয়ারি ২০২০)।’

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে উন্নয়নের বীজ বপন করেন। তার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ তার স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’, একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল দেশ অর্জনের পথ হিসেবে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে শুরু করে। একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ দেশের সূচনা ঘটে তখন। 

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। সেই সময়টিতে থেকে থেকে দুর্বৃত্তরা বারবার আঘাত হেনেছে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ওপর বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ধ্বংস করার দুরাশায়। কিন্তু তারা সফল হয়নি। তারা সফল হবে না। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশ যতই এগিয়ে যাবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন আর অর্জন আমাদের জাতির জন্য উত্তরোত্তর ততই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়