নুরের সহযোগীদের ‘মিথ্যাচার’

ইসরাইলি গোয়েন্দা মেন্দি এন সাফাদির সঙ্গে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুরের ছবি ফাঁস হয় কয়েকদিন আগেই। ছবিটি নিয়ে নানা নাটকীয়তার জন্ম দেন নুর। যদিও অবশেষে ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে বৈঠকের কথা স্বীকার করেছেন তিনি।

নুরের ছবিটি যেদিন প্রকাশ হয়, সেদিন থেকেই নুরের নাটকীয়তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে তৎপরতা শুরু করেন তার অনুসারীরা। এবারেই প্রথম নয়, ২০১৮ সালে উত্থানের পর থেকেই নুরের নানা অপকর্ম ঢাকতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপর ছিল তার অনুসারীরা।

সম্প্রতি দুবাই সফরে গিয়ে ইসরাইলি গোয়েন্দার সঙ্গে বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ছবিটি শুরুতেই এডিটেড বলে প্রচারণা শুরু করেন নুরের অন্যতম সহযোগী এবং সমর্থক তারেক। এ ছবির বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও ছবি পোস্ট করতে থাকেন তিনি। এমনকি বৈঠকের ঘটনার তন্ময় আহমেদকে শিবির বলে প্রচারণাও করে তারেক।

এর স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়ে উল্টো নিজেই স্বীকৃত গুজবকারীদের নিয়ে পুরাতন গুজব নতুন করে প্রচার করছেন নুর। বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের ওয়েব টিমের সমন্বয়ক তন্ময় আহমেদকে শিবির হিসেবে প্রমাণের জন্য ভিডিও এবং তথ্য অনলাইনে শেয়ার করছেন নুর, জ্যাকব মিল্টনসহ আরও বেশ কয়েকজন। মূলত নুরের থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পুরাতন ভিডিও নতুন করে শেয়ার করেছেন জ্যাকব মিল্টন।

শিবিরের হামলায় আহত হওয়ার পর তন্ময় আহমেদ মুমূর্ষু অবস্থায় ভর্তি ছিলেন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এ সময় তিনি মারা গেছেন কিনা তা দেখতে তার কক্ষে আসেন এই শিবিরকর্মী। এ হামলায় তন্ময় আহমেদের শরীরে ১৩০টি সেলাইয়ের চিহ্ন আজও রয়ে গেছে।

এর আগে, ২০২১ সালে তন্ময় আহমেদের বিরুদ্ধে 'সাবেক শিবির নেতা' হওয়ার দাবি করেন ড. কামালের মেয়ে জামাতা ডেভিড বার্গম্যানের নেত্র নিউজের সহকর্মী। এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন সেই সহকর্মী। পরবর্তীতে তন্ময় আহমেদকে শিবির হিসেবে প্রমাণের জন্য এক জামায়াত ইসলাম নেতার দ্বারস্থ হয় গুজবকারীদের একটি দল। তার রেফারেন্সে তন্ময় আহমেদকে শিবির হিসেবে প্রমাণের জন্য একটি ভিডিও ধারণ করেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়। যদিও পরবর্তীতে সরাসরি এই জামায়াত নেতার কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে গণমাধ্যমকে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানাননি। উল্টো নিজ ভিডিওতে তন্ময় আহমেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যাচ নিয়ে ভুল তথ্য প্রদান করেন এই স্থানীয় জামায়াত নেতা।

কিন্তু নুরের সঙ্গে ইসরাইলি নাগরিকের সাক্ষাৎ নিয়ে পোস্ট দেওয়া এবং পরবর্তীতে নুরের সঙ্গে এই লিকুদ পার্টির নেতা মেন্দি এন সাফাদির ছবির সত্যতা নিশ্চিত করে লাইভে আসার পর তন্ময় আহমেদকে নিয়ে গত বছর প্রকাশ করা একটি ভিডিও পুনরায় নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেন জ্যাকব মিল্টন। এর পাশাপাশি নুরের সমর্থক গোষ্ঠীও এ বিষয়ক ভিডিও ও পোস্ট শেয়ার করা শুরু করে।

নুরের সহযোগী তারেকের ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যায়, ডাকসুর সাবেক এ ভিপির পক্ষে বারবার প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন তিনি। এছাড়াও দেশবিরোধী নানা বক্তব্য নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন এই যুবক। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের ট্রেনিং দিয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গ্রেনেডসহ মিয়ানমারে পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থকে চটি বলে দাবি করেন তিনি এক ভিডিওতে। তার উগ্রবাদী এমন বক্তব্যের জন্য শাস্তি না হওয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন নুরের এই সমর্থক।

এর আগে জামায়াতের পক্ষ নিয়ে হুম্মাম কাদেরের সুরে নুর যেভাবে সাফাই গেয়েছিলেন (বাংলাদেশ ভারতের পেটের ভেতর ঢুকে যাবে) সেই বক্তব্যও প্রচার করেছেন তারেক। এছাড়া ভারতকে নিয়ে বারবার বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন নুরের এই অনুসারী।

অপরদিকে, ২০১৮ সাল থেকে রাশেদ খানকে নিজের অনুসারী হিসেবে সঙ্গে রাখছেন নুরুল হক নুর। যদিও ২০২১ সালের জুলাইয়ে আর্থিক লেনদেনসহ সাংগঠনিক কিছু বিষয়ে ঝামেলা, সংগঠনে নুরুলের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ও জবাবদিহির অভাবসহ বিভিন্ন কারণে নুরের সঙ্গে মনোমালিন্য হয় তার অন্য সঙ্গীদের। এ নিয়ে বিরোধের জেরে ফেসবুকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রাশেদ খান ও যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সোহরাব হোসেনকে পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়ে কারণ দর্শাতে বলেন নুরুল। এরপরেও রাশেদ বারবার নুরুলের পক্ষে অপপ্রচারে যুক্ত থেকেছেন।

ইসরাইলি গোয়েন্দার সঙ্গে বৈঠকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ছবিটি এডিট বলে দাবি করেছিলেন রাশেদ খানও। তিনি ছবিটিকে ফেক বলেও দাবি করেন। তবে নুর নিজে স্বীকার করার পরে মুখে কুলুপ এঁটেছেন রাশেদ।

চট্টগ্রামে মন্দিরে হামলার নেতৃত্বে ভিপি নুরের অনুসারি:

২০২১ সালে ১৫ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের আগে চট্টগ্রাম নগরীর জেএম সেন হল পূজামণ্ডপে হামলা হয়। সেদিন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ থেকে জুমার নামাজের পর মিছিল নিয়ে এসে জেএম সেন হল পূজামণ্ডপের গেইট ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা চালায় হামলাকারীরা। পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

এ হামলার ঘটনায় পরে যুব অধিকার পরিষদের নেতাকর্মীসহ দশজনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরুর রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদ, চট্টগ্রামের ৯ নেতাকর্মী ছিল।