গ্রীষ্ম প্রকৃতির শ্বাসরুদ্ধকর এক ফাঁদ। মানুষ গাছপালা পশুপাখি কীটপতঙ্গ অনুজীব-গোটা প্রকৃতিই সেই ফাঁদে আটকে হাঁসফাঁস দশা। গীতবিতানে বাংলার গ্রীষ্মকে বলা হয়েছে শুষ্ক তাপের দৈত্যপুরী-বৃষ্টিহীন বৈশাখী দিন, সন্তাপে প্রাণ যায় যে পুড়ে। বর্ষা এলেই বাংলা আবার স্বরূপে ফেরে-সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং। বাঁশের কোড়, মারফা চিনার জলডুবি আনারস, আরো কত কী উপহার বর্ষা দেবে পাহাড়িয়াদের। নিশ্চয়ই ঝরনার জল নেমে এসেছে এতদিনে, রাঙামাটির শুভলং নীল পাহাড় তাই সবুজে সবুজ এখন। পাহাড় তো বটেই বাংলার বর্ষার এমনই মাহাত্ম্য যে ধুলোর রাজধানী ঢাকার ধুলিধূসরিত সড়কগুলোকে পর্যন্ত তকতকে করে দিয়ে যায়। সেগুন গাছের ডালে উঁকি দিচ্ছে সোনাবউ। বর্ষা কত পাখিরও যে প্রজনন মৌসুম! বাংলার মাটির উত্পাদন শক্তি সত্যি গর্ব করার মতো। এই মাটির ঊর্বরতার প্রধান কারণ বর্ষা। ঢাকার বিখ্যাত মশা যারা কখনো কখনো শাহজালাল বিমানবন্দরের বিমান উড্ডয়নের বিলম্বের কারণ হয়ে অপরিমেয় দুর্ভোগ বাড়ায় এবং কোনো ওষুধই যাদের কাবু করতে পারে না তাদের উপদ্রব থেকে প্রাকৃতিকভাবে বাঁচিয়ে দেয় বর্ষা। সমস্ত গ্রীষ্ম জুড়ে পথের ধারের যে শিরিষ গাছগুলো রোদে পুড়ে পুড়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল প্রথম বর্ষার পানিতেই সেগুলো আবার সবুজ। কোনো কোনোটিতে ফুটেছে তুলোর মতো ফ্যাকাশে হলুদ ফুল, আর কী সুগন্ধী! কত মরা ডালে যে নতুন কুঁড়ি আসবে এই বর্ষায়। জীবনানন্দের প্রিয় চালতা ফুল ফোটার মৌসুম বর্ষা। বর্ষায় ফোটা বেশিরভাগ ফুলই অবশ্য সুরভিম্লিত। প্রায় দুশো প্রজাতির জুঁইয়ের অধিকাংশ ফোটে বর্ষায়। শ্রাবণের ঘন বর্ষায় ফোটে ফুরুস। বৃষ্টির জল না পেলে একান্ত বর্ষার ফুল দুপুরমনি দোলনচাঁপা স্বর্ণচাঁপার ঠিকঠাক রূপ খোলে না।
এই প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ দিন দিন বাড়ছে। কোনিট কোন্ ঋতুর নিজস্ব ফুল তা চিনতেও ভুল করছি। কদমকে একান্ত বর্ষার ফুল ভেবে বসে আছি। কিন্তু প্রকৃতিবিদ বিপ্রদাশ বড়ুয়া ধরিয়ে দিয়েছেন কদম শুধু বর্ষার ফুল নয়, গ্রীষ্মে ফোটে, এমনকি বসন্তেও। প্রকৃতির সঙ্গে দূরত্বের কারণে চিনতে না পেরে আমরা কতজন যে বৃক্ষমেলা থেকে অর্কিডের নামে ফার্ন কিনে আনি! কেক-পেস্ট্রি ফিরনি-পায়েসের ওপর চেরি ফল ভেবে করমচা সাজাই। চেরি করমচার মতো লম্বা নয়, কমলালেবুর মতো কিঞ্চিত্ চাপা। করমচাকে লাল রঙে সিদ্ধ করে চিনির সিরায় ডুবিয়ে চেরি হিসেবে গছিয়ে দিচ্ছে আমাদের। মাঝেমাঝে মনে হয় ঠিকই আছে ফল ব্যবসায়ীদের এই প্রতারণা। শহুরে নাগরিকরা যে কোনো ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের সর্বশেষ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত। প্রায় সব আ্যাাপসের সমস্ত গলি ঘুপচির আপডেট নখদর্পণে। মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটিং সিস্টেমে কবে ফাইভ জি এর রেডিও প্রযুক্তি প্রবেশ করবে, কোন্ স্পেকট্রাম ব্যান্ডে ফাইভ জি ব্যবহার হবে, কেমন করে ২০ এমবিপিএস গতি পাবে তা নিয়েও উত্কণ্ঠার শেষ নেই। অথচ এই স্মার্ট নাগরিকরাই ফুল-ফল চেনে না। কেন?
দুই
প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আমাদের বিস্ময়ের অন্ত নেই। ক্ষুদ্র তৃণ থেকে মহীরুহ, ছোট্ট টুনটুনি মুনিয়া থেকে বিশাল উটপাখি, প্রত্যেক প্রজাতি যেন টিকে থাকে তার জন্য প্রকৃতি তাদের মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে আত্মরক্ষার কৌশল। অনেক পাখি বাসা বানাতে পারে না। গাছের ডালে ঘুমায়। ঘুমন্ত পাখিরা কিন্তু কেউ ডাল থেকে পড়ে যায় না। যে পায়ের সাহায্যে পাখি ডাল আঁকড়ে থাকে সেই পায়ের চারটি আঙুলের একটি আঙুলের বড় বাঁকানো নখ দিয়ে ডালকে সাঁড়াশির মতো শক্ত করে রাখে। আবার যেসব পাখির পায়ের নখ অতটা বাঁকানো নয় তাদের বাসা বানানোর অপরিসীম দক্ষতা দিয়েছে প্রকৃতি। খেজুর, নারকেল পাতার চিকন আঁশ ঠোঁটে কেটে যে নিপুণ কৌশলে বাবুই তাল খেজুর নারকেল পাতায় ঝুলন্ত দুলন্ত বাঁশির মতো বাসা বানায় তাতে বিস্ময় না মেনে উপায় নেই। ভাবুন একবার একটি পাখি তার ঠোঁট দিয়ে প্রত্যেকটি আঁশ একই মাপে কাটছে ! এত সূক্ষ্মভাবে আঁশ কাটা কোনো ডিজিটাল মেশিনের পক্ষেও সম্ভব নয়। ইটভাটার সবচেয়ে ভালো জ্বালানি খেজুর গাছ। সে কারণে যেভাবে নির্বিচারে খেজুর গাছ কাটা হচ্ছে তাতে আগামীতে বাবুইয়ের বাসা দেখতে মিউজিয়ামে যেতে হতে পারে। যে পরিমাণ গাছ কাটা হচ্ছে সেই অনুপাতে লাগানো হচ্ছে না। তাছাড়া গাছ বড় হতেও তো সময় লাগে। খেজুর গাছ নিধনে শুধু যে বাবুইয়ের বাসা দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি তা নয়, ভেজাল গুড়ও খাচ্ছি জেনে বা না জেনে। গুড় তৈরির সবচেয়ে ভালো জ্বালানি ধান ক্ষেতের নাড়া, খেসারি, মুসুরি, সরিষার ডাঁটা। এগুলোর চাষাবাদ প্রায় উঠে গেছে বলে ভালো খেজুর গুড়ও আর পাওয়া যায় না। একসময়কার মানিকগঞ্জের ব্র্যান্ডেড হাজারি গুড় যার ভক্ত ক্রেতা ছিলেন বাংলার শেষ সুবেদার নবাব সিরাজ উদ দৌলা, সেই গুড় এখন গুণ ও মান হারাতে বসেছে।
কচুরিপানার ভেতর কিংবা পদ্ম ফুলের পাতায় পানকৌড়ি যে কৌশলে বাসা বানিয়ে টিকে থাকে সেও এক বিস্ময়ের বস্তু। সব পাখিরই বাসা বানানোর কৌশল প্রকৃতির আশ্চর্য বিস্ময়। আশ্বিন মাসের ভরা পূর্ণিমার ভরা পাঁচ দিন এবং শেষ পাঁচ দিন ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ সাগরের গভীর থেকে ডিম ছাড়তে ছুটে আসে মিঠা পানির মোহনায়। প্রকৃতিতে একটি প্রজাতির বিলুপ্তি মানে লক্ষ বছর ধরে লালিত প্রাণচক্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গ। সম্ভবত এ কারণেই একটি উড়ন্ত পাখির খাবারের জোগান দেয়ার জন্য প্রকৃতি তৈরি করে রেখেছে উড়ন্ত নানা জাতের পোকামাকড়, ড্রাগন মাছি, বিটল পোকা, মৌমাছি আরো কত কী।
তিন
বর্ষার কিছু ভোগান্তি নগর জীবনে আছে। তার দায় ভুল নগর ব্যবস্থাপনার। দীর্ঘদিনেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি এই নগরের। অধিকাংশ সড়ক ভাঙা। চলাচলের অনুপোযোগী। গরমে ধুলার যন্ত্রণা তো বৃষ্টিতে যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে কাদাজল। নজরদারির ব্যবস্থা সুষ্ঠু না হলে যা হয়। বর্ষার জরুরি দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা দুর্বল। এই দায় মোটেই বর্ষার নয়। বর্ষার মতো সুন্দর ঋতু হতে পারে না। শ্রাবণে নদীনালাগুলো টইটম্বুর হবে, ভাদ্র শেষে ঘন সবুজের আঁচল ঘিরে যে সাদা কাশফুল ফুটবে সেই কৃতিত্বও বৃষ্টি ছাড়া আর কার?
n লেখক :প্রাবন্ধিক