প্রস্ফুটিত হয়ে উঠুক নারীত্ব

মানবসমাজ বহুকাল ধরেই পুরুষত্বকে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। দীর্ঘকাল ধরে মনে করা হতো, নারীত্ব একমাত্র তখনই সঠিক অবস্থানে থাকতে পারবে, যখন সমাজ ঠিকমতো তার জীবনের সুরক্ষাটুকু নিশ্চিত করতে পারবে। আর এটি হবে সুস্থির একটি সভ্যতা ও সংস্কৃতির মাপকাঠিতে। কিন্তু আজ সমাজ সেই জায়গাটায় পৌঁছলেও, অর্থনীতিই কিন্তু এখন জগতের প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই কারণেই সবকিছু ফের ওই জঙ্গলের নীতিতেই ফিরে গেছে— যেখানে বলা হয় যে, যোগ্যতমদেরই বাঁচার অধিকার আছে। একটু অন্যরকম মনে হতে পারে, কিন্তু এটাও আদতে সেই টিকে থাকারই ব্যাপার।

নারীত্ব একটি সুন্দর ফুলের মতোই ফুটে উঠতে পারে নিশ্চিন্তের অবকাশে। কিন্তু যখন সে তা পারে না, তখন জীবন আপনাকে সবকিছু দিলেও জীবনের কাছে আপনার কিছুই পাওয়া হয় না। এজন্যই সমাজে খুব সচেতনভাবেই নারীকে প্রতিপালন করা ভীষণ জরুরি। তা না হলে আপনারা বিশাল কোনো গাছের মতন বেড়ে উঠবেন ঠিকই, কিন্তু সে গাছে কখনো ফুল ফুটবে না। তার মানে এটি এক ধরনের অর্ধেক জীবন কাটানোর মতোই ব্যাপার। আর অর্ধেক অপচায়িত জীবন তো মোটেও কোনো নান্দনিক জীবন নয়।

যে কোনো সমাজেই নারীশক্তিকে তার সঠিক স্থানটুকু দেওয়া ভীষণ জরুরি। যদিও পুরুষত্ব ও নারীত্বকে ঠিক পুরুষ আর মহিলা গোছের অঙ্ক দিয়ে মিলিয়ে দেখলেই চলবে না। এগুলো আসলে দুরকম গুণ। নারীর মধ্যে যেমন নারীত্ব থাকে, পুরুষের মধ্যেও তা একইভাবে ঋদ্ধ থাকতে পারে। এই দুটো গুণ যখন কারো মধ্যে সমান অনুপাতে থাকে, তখনই সে মানুষ জীবনের পূর্ণতাকে খুঁজে পায়।

এসব ব্যাপার দেখভাল করা উচিত একেবারে স্কুলের দিনগুলো থেকেই। নারীত্বকে যদি সত্যিই ফুটিয়ে তুলতে হয়, তাকে এগোনোর পথ করে দিতে হয়, তবে আমাদের এমন একটা সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই মূল্যবোধ আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথে যতখানি এগোবে আমাদের সন্তানেরা, ঠিক ততটাই যেতে হবে সংগীত, শিল্প, সাহিত্য ও দর্শনের পথে। এটা যদি না হয়, তবে বিশ্বে আর নারীত্বের কোনো জায়গা থাকবে না। তখন নারীজন্ম পেয়েও আদতে আপনি পুরুষালিই হয়ে উঠবেন। এজন্যই নারীত্বকে বরণ করা আজ এত জরুরি। না, এ কোনো নারীর বিষয়ে বলছি না, এ হলো নারীত্বের কথা।

যদি আপনি কোনো উপমা টানতে চান, যদি আপনি শিকড়কে বলেন পুরুষত্বের প্রতীক— তবে ভেবে দেখুন. ফুল আর ফল কিন্তু নারীত্বই। আর শিকড়ের উদ্দেশ্যই তো হলো ফুল ও ফলের জন্ম দেওয়া। তা-ই যদি না হয়, তবে শিকড়ের অস্তিত্বই তো বিফলে যাবে। শুধু বেঁচে থাকা দিয়েই সব কাজ মেটানো যায় না। বরং বেঁচে থাকাটুকু সুনিশ্চিত করার পরই জীবনের সূক্ষ্মতর ব্যাপারগুলো একে একে সামনে এসে দাঁড়ায়। আর তখন নারীত্ব যদি আপনার মধ্যে জাগ্রত না হয়—সে আপনি পুরুষই হন বা নারী—তা হলে ওই সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো আপনার মধ্যে কিছুতেই আসতে পারে না। তখন সারা জীবন নাগাড়ে আপনাকে শুধু বাঁচার কথাই ভাবতে হবে। হুবহু এই স্বভাবটিই হলো পুরুষত্বের লক্ষণ। কেননা তা সব সময়েই কিছু না কিছু জয় করতে চায়। উল্টো দিকে নারীত্ব কিন্তু এই জয়ের ব্যাপারে নেই। কেননা নারীত্বের স্বভাবই ফুল ফোটানোর, তৃপ্তি পাওয়ার, বেঁচে থাকার; জয় করার নয়। তাই এই পালাবদলটুকু ঘটাতেই হবে। নইলে এই জগেক খুব শিগগিরই আমরা নিঃশেষ করে ফেলব। অথচ এই গ্রহের শাসনভার যদি শুধু নারীদের ওপরেই থাকত, তাহলে আজকের এই বাস্তুসমস্যা ঘটত না। কেননা সেই পৃথিবী তো এমন হূদয়হীন আর অন্তহীন জয়ের পেছনে ছুটে বেড়াত না, বরং সে হয়ে উঠত নান্দনিকভাবে বেঁচে থাকার ঠিকানা।

n সৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন