প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটা ঘ্রাণ

‘সুখ’ হচ্ছে একটা অনুভূতি। তাই যদি হয়, তাহলে প্রশ্ন, ‘সুখ’ কাকে বলে? হ্যাঁ, মাঘ মাসের শীতে লেপের মধ্যে থেকে একটা পা কিছুক্ষণের জন্য বাইরে রেখে আবার লেপের ওমের মধ্যে প্রবেশ করানোর পর যে ‘অনুভূতি’ তা-ই হলো ‘সুখ’!

এই সুখ কেবল শীতকালেই অনুভব করা সম্ভব। শীতকালে ভালো লাগার রয়েছে নানা উপচার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সকালে টাটকা খেজুর রস পান, সরষে ফুলের বড়া, বোয়ালমাছ সহযোগে ধোঁয়াওঠা আলু-ফুলকপির তরকারি আর গরম গরম ভাত, এরপর উষ্ণ কম্বলের তলায় প্রিয়জনের সান্নিধ্যধন্য আশ্রয়, তখনই কেবল মনে হয় :লাইফ ইজ বিউটিফুল। আমরা শহরের নাগরিকরা শীতকালকে খুব ভালোবাসি। আমাদের দেশে শীতকাল অতিথির মতো। কয়েক দিনের জন্য আসে। আর এই অল্প কয়েকটা দিনের জন্যই সোয়েটার পরা, কম্বল-লেপের তলায় যাওয়া আর পানি গরম করে হাতমুখ ধোয়া। এরপর সারা বছর তো ঘামতেই থাকা।

বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে শীত মানেই বনভোজন, বিয়েশাদি, ভ্রমণ আর পিঠাপুলির উৎসব। কিংবা শীত মানে স্রেফ পথের ধারে দাঁড়িয়ে ধোঁয়াওঠা এক কাপ আগুন-গরম চা ধীরে ধীরে উপভোগ। শীত মানেই আনন্দ, ফুর্তি আর অলিখিত উৎসব। আমাদের সামর্থ্য যত সীমিতই হোক না কেন, এর মধ্যেও আমরা শীতকালকে উপভোগ করি। শীতের সকালে আয়েশ করে রোদ বা আগুন পোহানো, সুস্বাদু পিঠা খাওয়া, খেজুরের রস, পুকুরে মাছ ধরা কিংবা কুয়াশামাখা সবুজ প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর মজাগুলো ফিরে আসে।

আসলে, এই গরমের দেশে শীতকালে ঘাম কম হয় বলে বাঁচাটা সুন্দর। সুন্দর বলেই সেখানেও উৎসব। সূর্যের গনগনে আঁচ না থাকায় দুপুরবেলাগুলোতেও শহরে চাপ কম মনে হয়। আর সেই কারণেই বিশ্বাস করতেও ইচ্ছে হয় বারবার, হঠাৎ ফাঁকায় ছেড়ে দিয়ে চট করে নিজে হারিয়ে যাবে না কেউ! যে বিশ্বাস শীতকাল জুড়েই আমাদের প্রত্যেককেই এক দিনের ছোট উৎসব থেকে পরের দিনের বড় উৎসবের দিকে ঠেলে দেয়। কুয়াশায় চুবানো এক রকমের রোদ্দুর শেষ হয়ে আসে বাংলাদেশ জুড়ে। মানবতরঙ্গ ওঠে নামে। জল এসে ছুঁয়ে যায় সমস্ত সন্ধ্যারতি। পৌষ-মাঘের মানচিত্রের মধ্যে দিয়ে নিশ্চিন্তে হাল টেনে দেয় নিতাই মাঝি। তবে শীতের কিছু বাড়তি ঝামেলাও আছে। অধিক শীতে নারকেল তেল, ঘি ইত্যাদি জমে গেলেও মানুষের মাথার নার্ভগুলো এ সময় কেন জানি ঢিলা হয়ে যায়। হাইকোর্টের সামনের মোড়সহ দেশের 

বিভিন্ন স্থানে পাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। রাস্তাঘাটে ‘শ্রীপুরের বটিকা’, নানা রকম চুলকানির মলম, জটিল-কঠিন-দুরারোগ্য সব রোগের ওষুধ, সালসা, তাবিজ ইত্যাদি নিয়ে ক্যানভাসাররা আবির্ভূত হয়। পুনর্মিলনী, অ্যালামনাই, উৎসব, বই মেলা, পিকনিক, বিয়ে, সম্মেলন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদি শীতকালে প্রকট হয়ে দেখা দেয়। পুরোনো বাতের ব্যথা, অম্লতা, পিত্তশূল, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিসসহ নানারকম কোল্ড-ডিজিজ শীতের অতিথি পাখির মতো ব্যাপকভাবে দেখা দেয়। শীতের সঙ্গে এসবের সম্পর্ক অজ্ঞাত!

শীতের অনেক সুখের উপকরণ আছে। আবার অনেক কু-উপসর্গও আছে। শীতের প্রধান দুটি উপসর্গ হচ্ছে অকারণ উত্তেজনা আর চুলকানি! 

শীতের সকালে যখন উষ্ণ কম্বলের স্বর্গসুখ বিসর্জন দিয়ে নিতান্ত অনিচ্ছায় দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে গোসল-খাওয়া শেষে অফিসের উদ্দেশে রওনা হতে হয়, তখন মনে হয়, এর চেয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুও বুঝি সুখের! শীতের এসব অনুভূতির পাশাপাশি যা আমাদের এখনো স্মৃতিকাতর করে, তা হলো, ছোটকালের পৌষপার্বণ। শহুরে জীবনে এখন পৌষপার্বণ নেই, আছে কেবল পিঠাপুলির স্মৃতি! ছোটবেলার দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে! শীতের কথা, শীতের পিঠার কথা! একসময় পৌষ মাস ছিল বাঙালির পিঠা-উৎসবের মাস। শহর থেকে গ্রাম—এই উৎসব তখন চলত সবখানেই। তখনো যৌথ পরিবারে ভাঙন ধরেনি। মেয়েরা তখনো অন্দরমহল ছেড়ে চাকরির পথে পা বাড়াননি। একান্নবর্তী পরিবারে হেঁশেলের দায়িত্ব সামলাতেন মা-কাকিমা-জেঠিমারা। তারাই রান্না শেখাতেন। সেই সময়ে পৌষসংক্রান্তির দিন বাঙালির হেঁশেল ম-ম করত পিঠাপুলি আর পায়েসের গন্ধে। বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তখন তৈরি হতো নানা রকমের পিঠা। পুলিপিঠার মধ্যে থাকত মুগের পুলি, ভাঁজাপুলি, দুধপুলি, চন্দ্রপুলি আর সেদ্ধপুলি। অন্য ধরনের পিঠা বলতে, পাটিসাপটা, দুধ-চিতই, নারকেল পিঠা, দৈলা, চষি, গড়গড়া, ভাপা ইত্যাদি।

কী কী উপকরণ দিয়ে তৈরি হতো এসব পিঠা? আটা বা ময়দা, চাল গুঁড়ো, দুধ, খোয়া ক্ষীর, নারকেল কোরা, চিনি, খেজুর গুড়, মুগডাল বা বিউলির ডাল, আর সুজি। কখনো আলু বা মিষ্টি আলুও ব্যবহার করা হতো উপকরণ হিসেবে। আর থাকত পরিষ্কার সাদা সুতি কাপড়।

অনেক যত্ন ও সজাগ তত্ত্বাবধানে তৈরি হতো এসব পিঠা। পিঠা কতটা সুস্বাদু হবে, তা অনেকটা নির্ভর করে চাল কত নিখুঁতভাবে গুঁড়ো করা হয়েছে, তার ওপর। পৌষসংক্রান্তির আগের দিন গৃহস্থ বাড়িতে চাল ভিজিয়ে রাখা হতো। পিঠা তৈরির জন্য ভেজানো চাল কতটা নরম হতে হবে, এই বিষয়টা তখন মা-কাকিমাদের নখদর্পণে থাকত। তাদের নিখুঁত হিসাব একেবারে কাঁটায় কাঁটায় মিলেও যেত। এ তো গেল পিঠা তৈরির আগের পর্ব। সংক্রান্তির দিন সকাল সকাল স্নান সেরে নিয়ে পরিষ্কার কাপড় পরতেন মা-কাকিমারা। তারপর শুরু হতো পিঠা-পর্ব। পিঠা তৈরি করার সময় তারা সতর্ক নজর রাখতেন নিজেদের হস্তশিল্পের ওপর। হয়তো অজানা কোনো দেবতাকে বলতেন—মুখরক্ষা যেন হয়! তুমি দেখো, ঠাকুর! 

তখন ননস্টিক ফ্রাইং প্যান বা আধুনিক কোনো বাসনপত্রের জন্ম হয়নি। চালগুঁড়োও যে প্যাকেটবন্দি হতে পারে, সে ভাবনাও অকল্পনীয় ছিল। তা সত্ত্বেও কী নিখুঁতভাবে তৈরি হতো প্রত্যেকটা পুলি, পাটিসাপটা আর অন্য পিঠাগুলো! উনুনে আগুনের আঁচ যেন গৃহিণীদের হাতের ছোঁয়ায় নিজে থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যেত। একটা পাটিসাপটাও পুড়ে যেত না। কড়াই, তাওয়া আর খুন্তির যুগলবন্দিতে প্রত্যেকটাই কী দারুণ সুস্বাদু হয়ে উঠত!

খুব সাবধানে তৈরি করা হতো পুলিপিঠা। সেগুলো দুধে দিয়ে ফোটানোর সময় খুলে বা ফেটে গেলেই সর্বনাশ! সব পরিশ্রম তাহলে মাঠে মারা যাবে! কী উৎকণ্ঠাতেই না মা-কাকিমা-জেঠিমারা তাদের দিকে চেয়ে থাকতেন!

পিঠার সঙ্গে সংক্রান্তির দিনে তৈরি হতো নতুন গুড় দিয়ে পায়েসও। নতুন চাল আর গুড়ের সেই গন্ধ বাঙালির আরেক ঐতিহ্য! সেই গন্ধটা এখনোও নাকে লেগে রয়েছে! সংক্রান্তির সেই ঐতিহ্যপূর্ণ নৈবেদ্য বহু বাড়িতেই প্রথমে গৃহদেবতাকে নিবেদন করা হতো। পুলি-পিঠা-পায়েসের উৎসব সম্পূর্ণ হয়ে উঠত বাড়ির বয়স্ক নারী এবং নবীন মেয়েদের মেলবন্ধনে। রান্নাঘর সেদিন যেন একটা প্রথাবহির্ভূত স্কুল! সেখানে প্রবীণ নারীর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেন নবীন মেয়েরা।

একটা সময়ের পরে আস্তে আস্তে এই ছবিটা বদলাতে শুরু করল। সবার প্রথমে আর্থসামাজিক বদলের ছোঁয়া লাগল মালটিসিটিগুলোয়। সেখান থেকে বিশ্বায়নের ঢেউ এসে পৌঁছল শহরে। তার প্রভাব পড়ল গ্রামজীবনেও। ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করল যৌথ পরিবার। পিঠাপুলির চর্চা ক্রমশ অপসৃত হতে থাকল। পিঠা তৈরির মূল কারিগর যারা, তাদের বিরাট একটা অংশ পিঠা-পর্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হলো বাঙালির ডায়াবেটিস রোগ বা ‘সুগার’ এবং ‘ডায়েট কন্ট্রোল’ আর দেহ ঠিক রাখার জন্যে মিষ্টির প্রতি অনীহা। সব মিলিয়ে শহর থেকে গ্রাম—অনেকটা ম্লান হয়ে গেল পৌষপার্বণের একান্নবর্তী উৎসবের আবহ।

বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন মেলায় খাবারের স্টলে পুলিপিঠা বিক্রি হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে পাটিসাপটা, ভাপা পিঠাও। এই শীতকালের মেলা ছাড়াও অনেক জায়গায় ভাপা পিঠা বিক্রি হয়। মেলায় খাবারের স্টলে ঝাঁ-চকচকে এক্সপ্রো মেশিনের পাশে হয়তো কাচের পাত্রে রাখা থাকে পাটিসাপটা। তারপাশে হয়তো ভাপা পিঠা। কেমন অদ্ভুত লাগে! নতুন আর পুরোনোর কী অদ্ভুত সহাবস্থান! স্টলে যে নারী পিঠা তৈরি করেন, তাদের কখনো বলতে পারিনি—সংক্রান্তির দিন নিজের পরিবারের জন্য পিঠা তৈরি করেন তো?

আসলে সময় অনেক কিছু বদলে দেয়! যৌথ পরিবারের সেই রান্নাঘর এখন শুধুই স্মৃতি। এখনকার বাচ্চারাও ড্রিংকস, জুস, চকোলেট, আইসক্রিম, চিকেন ফ্রাই, চিপস, নুডুলস ছাড়া অন্য কিছু খেতে চায় না। তারা সেই পুলি-পাটিসাপটা-পায়েস অবশ্য পায়ও না! ব্যস্ত জীবনে কার সময় আছে এসব করার? আর এত পরিশ্রম করার মতো আহাম্মক যে কেউ নন!

সংক্রান্তির দিন, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো ব্যস্ত অফিসযাত্রী কি আজও সন্ধান করেন প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটা ঘ্রাণ—যে সুগন্ধ একদিন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল শৈশব ও কৈশোরের সঙ্গে, বাঙালি-জীবনের সঙ্গে?

এখন পরিণত বয়সে পৃথিবীর এক নম্বর দূষণের শহরে বসে খুব মনে পড়ে সেই পিঠা-উৎসব, পিঠার ঘ্রাণ, সেই হাড়-কাঁপানে শীতে মায়ের নিবিড় মমতা ও অমানুষিক শ্রমে তৈরি সুস্বাদু পিঠা-পায়েসের দিনগুলোর কথা!

লেখক : নিবন্ধকার