কিছুক্ষণ পরপরই ফোন আসছে। খুব উদ্বিগ্ন। বুঝাবার চেষ্টা করছে। ছোট চাকরি করি, কিছুদিন পর অবসরে যাবো। স্যার, চাকরি হারাতে চাই না। আমার কিছুই করার নেই। চাকরি হারালে পরিবার নিয়ে রাস্তায় বসতে হবে স্যার।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে কলেজের কাজে ঢাকা গিয়েছিলাম। কাজ শেষ করতে দেরি হয়ে গেল। ফিরতে পারলাম না। ঢাকা রয়েই গেলাম। পরদিন আমার এক বন্ধুর অফিসে গেলাম দেখা করতে। ফোনে কথা হলেও অনেকদিন দেখা না। বন্ধু ঢাকার একটা নামকরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
অনেকদিন পর দেখা, বেশ খুশি। আপ্যায়নের তালিকা বেশ লম্বা। কিন্তু আমার সঙ্গে কথাই বলতে পারছিল না। একটু পরপরই ফোন। আর ফোনেই ঐ কথাগুলো বলছিল আমার বন্ধু। কখনো চেয়ার থেকে ওঠে বাইরে যাচ্ছে। কখনো স্থানীয় সরকারি দলের নেতারা এসেও বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছে। ভর্তি না করলে অসুবিধা হবে। এখানে থাকতে পারবেন না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ছাত্রছাত্রীর ভর্তির শেষ তারিখের আগের দিনের ঘটনা এটা।
আমি যে উপজেলার একটা কলেজে শিক্ষকতা করি। সেখানকার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের চিত্রও একই। শুনেছি অনেক প্রভাবশালীর সুপারিশ নিয়েও আসছেন অনেকে। এখানেও প্রধান শিক্ষক বলছেন—আমার কিছুই করার নেই। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে অনলাইনে। ফলাফল অনলাইনে। মেধাক্রম অনুসারে সবার নাম, ছবিসহ ফলাফল দিয়েছে। তারপর ওয়েটিং লিস্টও দিয়েছে একইভাবে। এখানে ব্যত্যয় করার কোনো সুযোগ নেই। কথাগুলো যেন কোনোভাবেই অভিভাবকদের বোঝাতে পারছেন না। অভিভাবকদের একটাই কথা ক্লাসের লাস্টবয় সরকারি স্কুলে ভর্তি হবে। আর তার ছেলে ভর্তি হতে পারবে না। ইন্টারভিউ দিয়ে ভর্তি হতে না পারলে একটা সান্ত্বনা থাকত। কোনো কথা থাকত না। কিন্তু এ অবস্থা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
লটারির মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়ার ইতিবাচক দিক হলো, এখানে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের সুযোগ নেই বললেই চলে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর ভর্তি পরীক্ষার মতো প্রতিযোগিতার মানসিক কোনো চাপ নেই। ভর্তি কোচিংয়ের জন্য অভিভাবকদের টাকা গুনতে হচ্ছে না। ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পেলে অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দ্বারা সন্তান লাঞ্ছনা- গঞ্জনার শিকার হতো। কোথাও কোথাও শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটত। অভিভাবক নিজেকে সমাজে হেয় মনে করতেন। লটারির মাধ্যমে চান্স না পেলে কিছুটা হলেও এ অবস্থা থেকে সন্তান, অভিভাবক পরিত্রাণ পাবেন।
উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষক ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক শিক্ষাবিশেষজ্ঞ শফিকুল ইসলামের মতে—ক্যাচমেন্ট এরিয়ার জন্য ৫০ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি করা গেলে অপেক্ষাকৃত মেধাবীদের ভর্তির সুযোগ থাকত। এর ফলে অভিভাবক ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের হতাশা লাঘব করা হতো। তিনি আরো বলেন—লটারির মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভর্তিকৃত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মেধার বৈষম্য দূর হবে। কিন্তু একই বিদ্যালয়ে মেধার অসমতা সৃষ্টি হবে। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হবে। এর জন্য প্রতিটা বিদ্যালয় পরীক্ষা নিয়ে মেধাক্রমানুসারে সেকশন ভাগ করতে হবে। পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিয়ে তাদের নিতে হবে এগিয়ে। তা না হলে শিক্ষাকার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হবে।
আগে ভালো স্কুলগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভালো ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হতো। তাই ঐসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেজাল্টও হতো ভালো। এতে শিক্ষকদের পাঠদানে খুব বেশি দায়িত্বশীল না হলেও সমস্যা হতো না। ভালো ছাত্রছাত্রীরা প্রাইভেট-কোচিং করেও ভালো রেজাল্ট করত। যদিও প্রাইভেট, কোচিং-এ ভালো রেজাল্ট করলেও শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশ (জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা) হতো না। ভালো ফলাফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ গর্ব করত।
লটারির মাধ্যমে ভর্তির ফলে—এখন মেধার সমবণ্টনে ভালো স্কুলের দায় বেড়ে যাবে অনেকটা। তাদের আগের মতো থাকলে চলবে না। হতে হবে যত্নবান, দায়িত্বশীল। যেসব ছাত্রছাত্রী লটারির মাধ্যমে ভালো স্কুলগুলোতে ভর্তি হতে পারে নাই—এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের ভর্তির আগ্রহ খুব কম। তারা ভর্তি হচ্ছে প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে অভিভাবকদের শিক্ষা খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাজেটে জিডিপি অনুপাতে এক দশমিক ৮৩ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন শিক্ষায় জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয় করা উচিত এবং অনতিবিলম্বে তা ৭ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষমুখী করে শিক্ষার উদ্দেশ্য সফল করতে হবে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বলা হয়েছে—দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে পরিবারকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। ইউনেসকোর এই গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ৭১ শতাংশ বহন করে পরিবার। সরকার বহন করে মাত্র ২৯ শতাংশ। বর্তমান বাস্তবতায় যে হারে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার বাড়ছে, তাতে অভিভাবকদের শিক্ষা খাতে ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ এখনই বের করতে হবে।
জ্ঞানভিত্তিক নতুন শিক্ষাক্রমসহ শিক্ষার সার্বিক কার্যক্রমের নিয়ামক হলো শিক্ষকগণ। তাই শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করার ব্যবস্থা করতে হবে। মেধাবী জাতি গঠনের জন্য মেধাবী শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, কালিহাতী শাজাহান সিরাজ কলেজ, টাঙ্গাইল