বান্দরবানের রুমা উপজেলার সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সভাপতি নাথান বম। তিনি বিলাসী জীবনযাপন করেন। চাঁদাবাজির টাকাই এর উৎস। খুমি, লুসাই, খেয়াং, পাংখোয়া, ম্রো—এই পাঁচ সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার হাত ধরে ও তার প্রশ্রয়ে কেএনএফ প্রতিষ্ঠা করেন নাথান বম। পরবর্তীকালে তিনি গুরু মারা শিষ্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। নিজেই হতে চেয়েছিলেন জেএসএসের বিকল্প প্রতিষ্ঠানের বস।
জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের নামে, মোটা অঙ্কের টাকা আয় করার উদ্দেশ্যে, গহিন অরণ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ প্রদানের চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু সে কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ প্রদান বেশি দিন টিকিয়ে রাখতে পারেননি। র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সেই প্রশিক্ষণ আস্তানা তছনছ হয়ে যায়। তার গ্রুপের সদস্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শুরু করে পাড়ামহল্লায় চাঁদাবাজি। তাকে চাঁদা না দিলে নির্যাতন ও অপহরণ করা হতো। সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে মনোরঞ্জন করেন। এ জন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভয়ংকর এই সন্ত্রাসীর হাত থেকে বাঁচার জন্য সরকারের কাছে আকুতিও জানিয়েছেন তারা।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নাথান বম বর্তমানে মিজোরামের আইজল শহরে অবস্থান করছেন। তবে তার বাহিনী নিয়মিত চাঁদাবাজি করে আসছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত শনিবার রাতে মুয়ালপিপাড়ায় কেএনএফ সদস্যরা অবস্থান করছে জেনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে নামলে আর্থাপাড়া ও বাছালংপাড়ার মাঝামাঝি স্থানে অস্ত্রধারীরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পালটা আক্রমণ চালালে এক কেএনএফ সদস্য নিহত হন। আহত কিছু সংখ্যক কেএনএফ সদস্য সেখান থেকে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে গতকাল রবিবার সকালে নিহত কেএনএফ সদস্যের লাশ উদ্ধার করা হয়। সেখান থেকে একটি একনলা বন্দুক ও ৩০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। নিহতের নাম লালথান জুয়াল বম। তার বাড়ি রুমা উপজেলার আর্থাপাড়ায়। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে।
নাথান বমের বয়স ৪৫। বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার ২ নম্বর রুমা সদর ইউনিয়নের ইডেনপাড়ার বাসিন্দা মৃত জাওতন লনচেও’র ছেলে তিনি। বাবা জুমচাষি। মা মৃত রৌকিল বম গৃহিণী। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছোট।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) সন্তু গ্রুপের পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) যোগ দেওয়ার কারণে নাথান বমের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন সন্তু লারমা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে বিএ অনার্স ও এমএ পাশ করেন। এ ছাড়া তিনি লন্ডন থেকে আর্কিটেকচার বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাথান বমরা ছিলেন, দিনে এনে দিনে খাওয়ার মতো পরিবার। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তার বাবার পাশাপাশি ভাইকেও জীবনযুদ্ধে নামতে হয়েছিল। তার বড়ভাই জোয়াম লিয়ান বম (৬২) ছিলেন ইলেকট্রিশিয়ান। চতুর্থ ভাই রপুই বম পেশায় জুমচাষি। তিনিও কেএনএফ সদস্য বলে জানা যায়। নাথান বমদের পরিবার অনেক বড়। পরিবারের এত সদস্যের আহার যোগাতে নাথান বমকেও মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে টাকার জন্য জঙ্গিদের অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য চুক্তিও করেছিলেন। মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরামের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের দলছুট সশস্ত্র সদস্য ও নেতাকর্মীদের দিয়ে কেএনএফ গঠন হয়। এরপর বান্দরবান জেলার গহীন অরণ্যকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতায় অবশেষে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটি কোণঠাসা হয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সংগঠনের সভাপতি নাথান বম পালিয়ে যায়।