‘মায়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের যে আবেগ জড়িয়ে আছে তা অন্য কিছুতে নেই। সব দেশ-জাতি ভেদে মায়ের জায়গাটা অনেকটা একই। আমাদের ব্যক্তিগত, ধর্মীয়, জাতীয়, কিংবা সামাজিকভাবে মায়ের অবয়ব এসেছে স্বমহিমায়। আমরা মুক্তিযুদ্ধের অনেক চিত্রকর্মে দেখেছি মায়ের সাদা আঁচল সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে, কোলে তার নিথর সন্তান। আমাদের জাতীয় সংগীতে আছে ‘কি আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে’, দুর্গা, কালী, সরস্বতী সেও তো মা। আবার মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের স্বর্গ এসব তো ধর্মের কথা—মা, মায়ের আঁচলই তো দেশ।’ এভাবে বিশাল এক পতাকায় মায়ের অবয়ব নিয়ে সৃষ্ট শিল্পকর্ম নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন এর স্রষ্টা সাইদুল হক জুইস।
ব্র্যাকের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষ্যে আজ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ‘হোপ ফেস্টিভ্যাল’। ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ ‘সম্ভাবনার শক্তি’ এবং ‘যে পৃথিবী আমরা গড়তে চাই’ এই তিনটি প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাজানো হয়েছে তিন দিনের অনুষ্ঠানমালা।
এই আয়োজনে স্থান পাবে ঐ ‘মা শিল্পকর্ম’। সম্প্রতি উত্তরায় শিল্পীর স্টুডিওতে কথা হয় তার এ কাজ নিয়ে। ৩২ ফুট দীর্ঘ ও ৯ ফুট উঁচু এই শিল্পকর্ম সৃষ্টি করা হয়েছে জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রঙে। মাঝখানটাতে রক্ত লাল আর চারপাশ ঘিরে আছে ঘাসের সবুজ। এক মায়ের বিছানো আঁচল তলে অন্য মায়েরাও আছেন। শিল্পী জানান, চার সপ্তাহে ছয় জন লোক কাজ করেছেন এটি নির্মাণে। কখনো সারা রাত কখনো আবার সারা দিনরাতও লেগেছে কাজটি সম্পন্ন করতে।
শেষ মুহূর্তের কাজ চলছিল তখন। শিল্পী জানান, কাজটি যখন তাকে করতে দেওয়া হয় তখন স্যার ফজলে হাসান আবেদের একটি উক্তি—‘যাবতীয় ধ্বংস আর বিনাশের মধ্যে দাঁড়িয়েও এই ভূখণ্ডের মানুষের ক্ষমতা রয়েছে পুনরায় উঠে দাঁড়াবার’—হাতে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই তিনি মূল ধারণাটা নেন। তিনি বলেন, আজও আমাদের অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছেন কৃষকের ছেলেমেয়েরা। শহরের গার্মেন্টসে যারা কাজ করেন তারা প্রান্তিক নারী, আবার বিদেশ-বিভুঁইয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা রেমিট্যান্স আনছেন তারা গ্রামের মানুষ। তারা আয় করে আর আমরা বিদেশে বেড়াতে গিয়ে তা খরচ করি। যখন তারা কাজ করতে বাইরে যায় তখন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্মার্ট ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন—এই বিষয়গুলো ভাবলে আমি আবেগতাড়িত হই। আমি যদিও তাদের নিয়ে সেভাবে কোনো কাজ করিনি। কিন্তু ‘বিনাশের মধ্যে দাঁড়িয়েও আবার ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বললে তাদের শক্তিকেই দেখা যায়।
বিশেষ এই মায়ের শিল্পকর্ম নিয়ে বলেন, শিল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ কোনো ব্যাখ্যা হয় না। যে দেখবেন সে তার মনের ব্যাখ্যাতেই বুঝে নেবেন। তারপর মা বলে এক প্রধান মায়ের সঙ্গে এখানে বেশ কয়েক জন মা রয়েছেন। তারা সবাই এই দেশেরই মা। ব্র্যাক নারী-শিশুকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে—সে জায়গা থেকে এভাবে ভেবেছি আমি। আমি জানি এই চিত্রকর্ম শেষ হলে আমার আত্মতৃপ্তি হবে না। কখনো হয়ও না। দেশের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অনেক ভালো কাজ যেমন হচ্ছে আবার অনেক কাজে প্রতিবন্ধকতা চলে এসেছে। তার স্টুডিওতে দেখালেন, সাত-আট ফুটের বড় মুখোশ, নারী, পুরুষ, পশু নানা কিছুই আছে। প্রশ্ন করলে তিনি জানান, এক সময় অনেক মুখোশ করেছি। শুরুর দিকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমিই বাঘের, দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে অনেক মুখোশ করেছি, কোনো বাধা পাইনি। সেই সময় সনাতন ধর্মের দেবীদের মুখ এসেছে। এই সময়ে আমাকে কেউ কেউ এমন মুখোশগুলো ফিরিয়েও দিচ্ছে। তাদের বোঝাতে হবে এটি শিল্পকর্ম।
দেশে নারী শিল্পীদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব সময় নারীদের খাটো করে দেখার প্রচেষ্টা থাকে। নারীরা সব ক্ষেত্রে কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভালো করছেন। আমার স্ত্রীও একজন শিল্পী। আমি তার ধৈর্যের কাছে হার মানি। শিল্প অনেক ধরন বরণ করেছে। স্কাল্পচার যেমন আছে তেমন নানা ধাতু দিয়ে হচ্ছে শিল্প। এটিই শিল্পের গতিশীলতা, সময়ের সঙ্গে বহতা। সময়ের সঙ্গে বয়ে যাবে আসবে নতুন ধরন, যা কিছু ইতিবাচক শিল্পের মাধুর্য আর শৈল্পিক সৌন্দর্য আছে তা রয়ে যাবে। এমন কাজের মধ্য দিয়ে শিল্পীও বেঁচে থাকবেন।
প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই আয়োজনে দর্শকদের জন্য থাকছে আবহমান বাংলার চিরায়ত লোকজ সংস্কৃতির সম্মিলন, পুঁথিপাঠ, গল্পপাঠের আসর, বায়োস্কোপ, পুতুল নাচ, শিশুদের খেলার জগৎ, আলোচনা অনুষ্ঠান ও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।