সেবামূলক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ওয়াসায় সিস্টেম লসের নামে পানি চুরি, উত্পাদন নিয়ে হিসাবে গড়মিল, বিল আদায়ে অনিয়ম, বকেয়া অনাদায় ও মিটারবিহীন পানির সংযোগ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ওয়াসায় একটি শক্তিশালী পরিচালনা পরিষদ থাকলেও বছরের পর বছর চলমান এসব অনিয়ম বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং অনিয়ম বেড়েই চলেছে। অভিযোগ উঠেছে রাজস্ব বিভাগে দীর্ঘদিন যাবত্ ঘুরে ঘুরে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে ওয়াসা লাভের মুখ দেখছে না। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করতে সম্প্রতি ওয়াসা পরিচালনা বোর্ড তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে।
অনিয়ম চিহ্নিত করতে গঠিত কমিটির প্রধান ও ওয়াসা পরিচালনা বোর্ডের সদস্য জাফর আহমেদ সাদেক ইত্তেফাককে বলেন, পানির উত্পাদন, বিতরণ, সিস্টেম লস ও রাজস্ব বিভাগ নিয়ে নানা অভিযোগ এসেছে। প্রাথমিক তথ্যে মনে হচ্ছে— বিপুল পরিমাণ পানি চুরি হচ্ছে। প্রকল্প নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় তদন্ত চিহ্নিত করে আমরা মিডিয়াকে জানাব।’
জানা যায়, ওয়াসায় বর্তমানে তিনটি পানিশোধনাগার ও গভীর নলকূপ থেকে পানি সরবরাহ দিচ্ছে। ওয়াসার পানি শোধনাগারগুলোতে উত্পাদন পরিমাপের মিটার রয়েছে। কিন্তু শোধনাগারগুলোর পানি উত্পাদন রেকর্ড নিয়ে হিসাবে গড়মিলের অভিযোগ উঠেছে। রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত শেখ হাসিনা পানি শোধনাগারে উত্পাদিত পানি পাইপ লাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরের নাসিরাবাদ এলাকায় নির্মিত রিজার্ভে এনে নগরীতে সরবরাহ দেয়া হয়। রিজার্ভেও পানি পরিমাপের মিটার রয়েছে। মদুনাঘাট পানিশোধনাগারের পানি কালুরঘাট বুস্টার থেকে নগরীতে সরবরাহ দেয়া হয়। এখানেও পানি পরিমাপের মিটার রয়েছে। মোহরা পানি শোধনাগারের পানি সরাসরি নগরীতে সরবরাহ দেয়া হয়। ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, পানির উত্পাদন খরচ অনেক বেড়েছে। ভর্তুকি দিয়ে গ্রাহকপর্যায়ে পানি সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু শোধনাগার গুলোতে যে পরিমাণ পানি উত্পাদনের হিসাব দেখানো হচ্ছে তার সাথে রিজার্ভ থেকে সরবরাহকৃত পানি হিসাবে বিরাট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে ওয়াসা প্রতিদিন সাড়ে ৩৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ দিচ্ছে। এর মধ্যে ২৬ থেকে ২৮ শতাংশ পানি সিস্টেম লস দেখানো হচ্ছে। নতুন প্রকল্প চালু হওয়ায় ওয়াসার পানি সরবরাহ বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে সিস্টেম লসও বেড়েছে। বেশির ভাগ এলাকায় পানির সরবরাহ লাইন পরিবর্তন করে নতুন পাইপ লাইন বসানো হয়েছে। এর ফলে পাইপলাইন থেকে পানির অপচয় আগের মতো হচ্ছে না। তারপরও সিস্টেম লস না কমা নিয়ে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে। সিস্টেম লসের কারণে মাসে প্রায় আড়াই কোটি টাকা রাজস্ব আয় হারাচ্ছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
ওয়াসার রাজস্ব বিভাগের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, পানির নিয়মিত বিল থেকেও আদায় কম হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। নিয়মিত বিলিং থেকে আদায় কম হওয়ায় বকেয়ার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। প্রায় ৩৩ হাজার গ্রাহকের কাছে এসব বকেয়া রয়েছে।
জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, হোল্ডিংয়ের সাথে পানি সংযোগ মিলানো যাবে না। প্রতিমাসে ১০০ থেকে ১৫০ পানি নতুন সংযোগ দেয়া হচ্ছে।পানিশোধনাগার ও রিজার্ভে পানি পরিমাপের ডিজিটাল মিটার রয়েছে। পানি বিল আদায়ও কম হচ্ছে। এর কারণে বকেয়ার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। তাই পানির উত্পাদন,বিতরণ,সিস্টেম লসসহ অনিয়মগুলো চিহ্নিত করতে ওয়াসা পরিচালনা বোর্ড কমিটি করে দিয়েছে। তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর করণীয় ঠিক করা হবে।’