ডিআইজি মিজানের ঘুষ কেলেঙ্কারি তদন্তে কমিটি

পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইজিপির নির্দেশে সোমবার এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার (ডিআইজি মিজান) বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. সোহেল রানা।

অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অ্যাডমিন অ্যান্ড অপারেশন) ড. মইনুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) শাহাবুদ্দীন কোরেশী ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার মিয়া মাসুদ হোসেন। পুলিশ  সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক সোহেল রানা বলেন, ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিআইজির বিরুদ্ধে সর্বশেষ অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতির অনুসন্ধান নিজের পক্ষে নিতে দুদক কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। ঘুষ নেওয়া এবং দেওয়া-দুটোই আইনের চোখে অপরাধ। ডিআইজি প্রকাশ্যে এই অপকর্ম করার কথা ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ পুলিশের প্রকাশ্য কোনো তত্পরতাই নেই তার বিরুদ্ধে। যদিও খোদ প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ঘুষ যিনি দিয়েছেন এবং নিয়েছেন-ব্যবস্থা নেওয়া হবে দুই জনের বিরুদ্ধেই।

ডিআইজি মিজান যাকে ঘুষ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন, তিনি দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। গত ১০ জুন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুদক। কিন্তু পুলিশের নির্লিপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছিল। ডিআইজি মিজানকে তারা বাঁচাতে চাইছে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কারণ এর আগেও ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর একটি অভিযোগের তদন্ত করেছিল পুলিশ। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনও পাঠানো হয়। কিন্তু প্রায় দেড় বছরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ডিআইজি মিজান গণমাধ্যমের শিরোনাম হন ২০১৭ সালের একেবারে শেষের দিকে। তখন তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কাজ করছিলেন। ওই বছরের মাঝামাঝি সময়ে এক নারীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিয়ে করার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। একটি জাতীয় দৈনিকে বিস্তারিত তথ্য ছাপা হলে তদন্ত করে পুলিশ। ডিআইজিকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। এর পরেও আরো একটি গুরুতর অভিযোগ উঠে ডিআইজির বিরুদ্ধে। তখনও পার পেয়ে যান তিনি।

২০১৮ সালের এপ্রিলের দিকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের উপস্থাপিকা ও তার স্বামীকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ডিআইজির বিরুদ্ধে। ওই উপস্থাপিকা সে সময় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু তার তদন্ত আর করেনি পুলিশ। কেন তদন্ত হয়নি, এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। এরপর ওই নারীর নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে অশালীন ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাতেও ডিআইজির বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জমা পড়ে। কিন্তু তারও তদন্ত আর আগায়নি। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন ডিআইজির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে। তদন্তে দেখা যায়, এই পুলিশ কর্মকর্তার বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে যা তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

ডিআইজি মিজান বারবার পার পেয়ে যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে ঘুষ কেলেঙ্কারির তদন্ত ও বিচার নিয়েও আছে সংশয়। গত ১১ জুন গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা টিআইবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই সংশয় প্রকাশ করেন। ডিআইজি মিজানের বিষয়ে পুলিশ তথা সরকারের নির্লিপ্ততায় বিস্মিত খোদ দেশের সর্বোচ্চ আদালতও। গত ১৬ জুন অন্য একটি মামলার শুনানিতে তার প্রসঙ্গ এলে বিচারপতি বলেন, ‘ডিআইজি মিজান কি দুদকের চাইতে বড়? এই মামলায় তাকে কেন দুদক অ্যারেস্ট করছে না?’