জগদ্দল বিহারে প্রত্নতাত্ত্বিক পুনঃখনন শুরু

নওগাঁর ধামইরহাটে জগদ্দল বিহার পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি ও সাবেক হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার এমপি। 

nowga jogoddol bihar-1

জানা গেছে, একাদশ শতকে বিদ্রোহী বঙ্গাল সৈন্য কর্তৃক পাহাড়পুর (সোমপুর) বিহার আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ হয়। এই বিশৃঙ্খলা এবং বাইরের আক্রমণের ফলে পাল সাম্রাজের সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠন হয়ে যায়। বরেন্দ্র অঞ্চল কিছু কালের জন্য স্থানীয় কৈবত নায়েব দিব্যোক এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র ভীমের শাসনাধীনে চলে যায়। একাদশ শতকের শেষার্ধে ভীমকে পরাজিত করে রামপাল প্রিয় পিতৃভূমি বরেন্দ্র উদ্ধার করেন। এরপর তিনি প্রজা সাধারণের অকুণ্ঠ ভালোবাসা অর্জনের জন্য মালদহের সন্নিকটে রামাবতী নামক রাজধানী এবং এর নিকটবর্তী স্থানে জগদ্দল মহাবিহার (বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিহারে খ্যাতনামা বিদগ্ধ পন্ডিতরা শিক্ষা প্রদান ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এদের মধ্যে বিভূতিচন্দ্র হলেন একাধারে গ্রন্থাকার, টিকাকার, অনুবাদক ও সংশোধক। তিনি কিছুদিন নেপাল ও তিব্বতে ছিলেন এবং তিব্বতীয় ভাষায় অনেক বই অনুবাদ করেছিলেন। আচার্য দানশীল প্রায় ৬০ খানা তন্ত্র গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন। আচার্য মো কর গুপ্ত তর্কভাষা নামক বৌদ্ধ ন্যায়ের ওপর একটি পুঁথি লিখেছিলেন।

nowga jogoddol bihar-2

স্থানীয়রা জানান, জগদ্দল বৌদ্ধ বিহারের ইতিহাস অনেক পুরনো। বৌদ্ধ বিহারটির মাঝে জলভরা একটি কুয়া দেখেছি। সেখানে লোহার জিঞ্জিরে বাঁধা ছিল একটি বালটি। জলভরা বালতি তুলতে গেলে মাঝপথে এসে তা আটকে যেত। সে কুয়ার জল কেউ তুলতে পেরেছেন বলে আমার জানা নেই। সময়ের পরিবর্তনে কুয়াটি মাটির আস্তরণে ঢেকে গেছে। বৌদ্ধ বিহারটির আশপাশে কয়েকটি পুরনো দীঘি রয়েছে। 

nowga jogoddol bihar-3

এলাকার প্রবীরদের কাছ থেকে শোনা গেছে, কোনো এক রাজা ধুক্কাধনুক মারার পর সেখানে একটা জলভরা দীঘি হয়। সেটি এখন টুটকামারি দীঘি নামে পরিচিত। দীঘিটিতে পাঁচ থেকে সাতটি ঘাট রয়েছে। সেই থেকে এই অবধি দীঘিটি খনন ছাড়াই এখনও অক্ষত অবস্থায় নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আনুমানিক ২০০০ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের লোকজন এসে এই বিহারের পশ্চিম প্রান্তে আংশিকভাবে খনন কাজ শুরু করেন। তারপর থেকে এই অবধি বিহারের অংশভাগ এখনও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এখানে আংশিক খননকালে বহু মূল্যবান প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ পাওয়া যায়। এখান থেকে সংগৃহীত মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ও উপকরণগুলো প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার জাদুঘরে আর কিছু অংশ রাজশাহীতে সংরক্ষণের জন্য নিয়ে যায়।

nowga jogoddol bihar-4

ইউনেস্কো ও ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের সম্ভাব্য তালিকায় জগদ্দল মহাবিহারের নাম রয়েছে। ২০১৩ সালে বিহারের খননে জগদ্দল বিহারের পশ্চিম বাহুর একটি খনন করতে গিয়ে একটি সুড়ঙ্গের মধ্যে পাওয়া যায় ১৩টি ব্রোঞ্জের বৌদ্ধ মূর্তি।  

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, জগদ্দল বিহারই লোটাস (পদ্ম মহাবিহার) বিহার। ২০১৪ সালে বিহারের উত্তর বাহু খননে বেরিয়েছে পোড়া মাটির টেরাকোটা। যা বিহারের দেওয়ালে সারিবদ্ধভাবে লাগানো রয়েছে।

nowga jogoddol bihar-5

বিহারে এ পর্যন্ত খননে বেরিয়ে এসেছে ৩৩টি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ। প্রতিটি কক্ষেই বৌদ্ধ মূর্তি রাখার জন্য পৃথক ব্যবস্থা ছিল। পাওয়া গেছে বিহারের পূর্বমুখী প্রধান প্রবেশদ্বার এবং ৮ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৮ মিটার প্রস্থের হল ঘর। যেখানে অতিথিরা এসে অপেক্ষা করতো বিহারে প্রবেশের অনুমতির জন্য। এ হল ঘরে পাওয়া গেছে চারটি গ্রানাইট পাথরের পিলার যা ইতিপূর্বে বাংলাদেশের কোনো বৌদ্ধ বিহারে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে বিহারের ছাদের ভগ্নাংশ যার পুরুত্ব ৬০ সেন্টিমিটার। বিহারটির আশপাশে এখনও পড়ে রয়েছে অসংখ্য পাথরের সাদাকালো বিম ও পিলার।

nowga jogoddol bihar-6

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, ব্যাপক অনুসন্ধান, উৎসখনন ও গবেষণার মাধ্যমে পাল সম্রাট রামপালের রাজধানী রামাবতীর সন্ধান মিলে যেতে পারে এ জগদ্দল বৌদ্ধ বিহারে।  

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, সেই রামাবতী নগর এখানেই ছিল। কেন না কাছেই রয়েছে চকআমাইর নামে একটি জনপদ। ভৌগলিক অবস্থান, ভবন-অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ ও নামের সঙ্গে কিছুটা মিল থাকায় আড়ানগর ও লক্ষণ পাড়ার সন্নিকটে চকআমাইর গ্রামটিই ‘রামাবতী’ বলে অনুমিত হয়।

জগদ্দল বিহার পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন শহীদুজ্জামান সরকার এমপি। ছবি: ইত্তেফাক

প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানা জানান, ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দে প্রাথমিকভাবে ১ মাস খনন ও গবেষণা পরিচালনা করা হবে। এবং চাহিদা অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। 

nowga jogoddol bihar-7

প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চন্দন কুমার দে বলেন, সারাদেশে আমার প্রায় ৫ শতাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এলাকা রয়েছে। যার সিংহভাগই অরক্ষিত রয়েছে। আমরা তা সংরক্ষণে কাজ করছি।

nowga jogoddol bihar-8

সংসদ সদস্য শহীদুজ্জামান সরকার বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধামইরহাট উপজেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে ধামইরহাট জগদ্দল বিহারে ছোট আকারে একটি মিউজিয়াম যাতে করা হয়, আমি সেই প্রস্তাবনা ইতিমধ্যেই দিয়েছি। বাস্তবায়ন হলে আমরা বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রকৃতি ও তার প্রাণ ফিরে পাবো।

nowga jogoddol bihar-9

উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক চন্দন কুমার দে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আতাউর রহমান, প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের রংপুর ও রাজশাহী রিজিওয়ের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানা, উপজেলা চেয়ারম্যান আজাহার আলী, ইউএনও আরিফুল ইসলাম, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কাস্টডিয়ান ফজলুল করিম আরজু, ওসি মোজাম্মেল হক কাজীসহ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।